নিজের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির তদন্ত ঠেকাতে খোদ আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকেই ‘সরিয়ে’ দিয়েছিলেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরী।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, অন্য সব উপায়ে ব্যর্থ হয়ে শওকত আলী ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার (বিএফআইইউ) প্রধান এ এফ এম শাহীনুল ইসলামকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে পদচ্যুত করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। আর তাতে সক্ষমও হন তারা।
এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হওয়ার মাত্র ৪৯ দিন পরই শাহীনুলকে সরে যেতে হয়। এতে চাপা পড়ে যায় একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত কার্যক্রম। শুধু প্রধান নন, পুরো গোয়েন্দা টিমকেই সেসময় ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
গত ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর পর শওকত আলী, তার পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট জব্দ রাখতে এবং পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণ লেনদেন বিবরণী জমা দিতে দেশের সব ব্যাংককে নির্দেশ দেয় বিএফআইইউ।
৮ জুলাই থেকে নথি যাচাই শুরু করে অনুসন্ধানকারী দল। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তারা প্রাথমিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে।
আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটির কয়েকজন সদস্য টাইমসকে জানিয়েছেন, অনুসন্ধান চলাকালেই নানামুখী চাপ আসতে থাকে। তবে প্রবল চাপের মুখেও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
বিএফআইইউ’র খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, শওকত আলী, তার পরিবার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালিত অ্যাকাউন্টে মোট ১৬ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকে পরিচালিত তার ব্যক্তিগত সঞ্চয়ী হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করেছেন ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এই দুটি হিসাবের টাকা তিনি ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যবহার করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে তিনি কর ফাঁকি দিয়ে থাকতে পারেন।
খসড়া প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশি সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া এখনো চলমান।’
এই তদন্ত চলাকালেই ১৭ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহীনুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পরই বিএফআইইউ প্রধান চাকরি হারান।
তবে টাইমসের অনুসন্ধান বলছে, এটি আসলে ছিল শওকতের সাজানো ‘হানি ট্র্যাপ’।
ভিডিও প্রকাশের একদিন পর, ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মৌখিক নির্দেশে শাহিনুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠান।
বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন কর্মকর্তারা বলছেন, বিএফআইইউ একটি স্বাধীন গোয়েন্দা সংস্থা হওয়ায় গভর্নরের এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। এর প্রধানের নিয়োগ ও তার বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এখতিয়ার কেবল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হাতে।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহীনুল টাইমসকে বলেন, ‘ভিডিও প্রকাশের পর আমি গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তাকে এটাও জানিয়েছিলাম যে, শওকত আলী এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে তা ছড়িয়ে তদন্ত ভেস্তে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।’
যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফরেনসিক পরীক্ষায় ভিডিওটি ‘আসল’ বলে নিশ্চিত করে।
শাহীনুল ছুটিতে যাওয়ার পর বিএফআইইউ শওকতের বিরুদ্ধে তদন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় অন্য দায়িত্বে। এই তদন্ত বন্ধ হওয়ার আগে যে খসড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল, তার একটি কপি সংগ্রহ করেছে টাইমস।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএফআইইউ’র উপ-প্রধান মো. মফিজুর রহমান খান চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘একটি গোয়েন্দা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি নেই আমার।’
এদিকে শাহীনুলকে ছুটিতে পাঠানোর পর গভর্নরের নির্দেশে বিএফআইইউ নিজেদের প্রধানের বিরুদ্ধেই অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করে। শাহীনুল ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাবগুলোর লেনদেন যাচাই করে সংস্থাটি। এ সময় তার হিসাবে ২৩ লাখ টাকা ও স্ত্রীর হিসাবে দুই পর্বে ২০ লাখ টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বিএফআইইউ এই তথ্য গভর্নরের কাছে পাঠায়।
কয়েকজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, এটি গভর্নরের প্রথম হস্তক্ষেপের ঘটনা নয়। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল গভর্নরের কার্যালয় থেকে বিএফআইইউকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। যেখানে বলা হয়, ইউনিটটি যেন প্রতি মাসে তাদের পুরো কার্যক্রমের প্রতিবেদন গভর্নরের কাছে জমা দেয়।
চিঠিতে উল্লেখ ছিল, ‘গভর্নর মহোদয় নিয়মিতভাবে প্রতি মাসে বিএফআইইউর সকল কার্যক্রম রিপোর্ট আকারে অবহিত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন।’
সংস্থাটি স্বাধীন হওয়ায় গভর্নরের এমন নির্দেশ দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছেন এর কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই গভর্নর ও শাহীনুলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, যদিও কারণটি তারা জানতেন না।
এ বিষয়ে গভর্নরের মন্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে টাইমস, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।
এদিকে বিএফআইইউ প্রধানের ভিডিও বিতর্কের মধ্যেই ইস্টার্ন ব্যাংক শাহীনুলের একটি অ্যাকাউন্টের লেনদেন বিবরণী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর গোয়েন্দা শাখায় পাঠায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শওকত আলী এই ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহিনুল ইস্টার্ন ব্যাংকের একটি স্টুডেন্ট ফাইল ব্যবহার করে তার মেয়েকে কানাডায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন।
এই তথ্য প্রকাশের পরও বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। সেসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওই পরিমাণ টাকা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া, ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো অর্থকে মানি লন্ডারিং বলা যায় না।’
‘যদি ঘোষিত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতি পাওয়া যায়, সেটা দেখার দায়িত্ব এনবিআরের।’
অনুসন্ধানে শওকতের ট্যাক্স ফাঁকির আরও তথ্য পেয়েছে টাইমস। ২০১৬ সালে তিনি একটি নতুন বিলাসবহুল মার্সিডিজ বেঞ্জ জি৬৩ গাড়ি আমদানি করেন, যার জন্য তিনি অবৈধভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়েছেন। গাড়িটি ২০২২ সালের ২৩ মার্চ কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জব্দ করে।
তিনি গাড়িটির আমদানিমূল্য ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঘোষণা দিলেও কর-শুল্কসহ গাড়িটির প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল ১০ কোটিরও বেশি।
ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরির বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে গত ১৫ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ফোন ও বার্তার মাধ্যমে শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


