জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট নিয়ে আপাতত রাজনৈতিক সংকট কেটেছে। তবে নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে নাগরিকদের মনে। প্রধান উপদেষ্টা বৃহস্পতিবার তার ভাষণে গণভোটের যে ব্যালট পেপারের কথা বলেছেন, এতে পুরোপুরি স্বাধীন মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট ইস্যুতে বড় তিনটি রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে বিভেদ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে এই তিন পক্ষকেই খুশি করার চেষ্টা করেছেন। বিএনপির দাবি অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হবে। জামায়াতের দাবি অনুসারে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতেই জাতীয় সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠন হবে। আর জাতীয় নাগরিক পার্টির দাবি অনুসারে গঠন হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, জুলাই সনদকেও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এই জুলাই সনদ অনুমোদনে যে গণভোট হবে, তার একটি ব্যালট পেপারও উপস্থাপন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। সেই ব্যালট পেপার নিয়েই নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই সনদে ধারা রয়েছে ৪৮টি। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য অনুসারে, এর ৩০টি প্রস্তাব সম্পর্কে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। কয়েকটি প্রস্তাব সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলেও তাদের মতভেদ খুব বেশি নয়। আর বাকি কয়েকটি প্রস্তাব সম্পর্কে তাদের মতভেদ অনেক বেশি।
গণভোটের প্রস্তাবিত ব্যালট পেপারে কোনো ভোটার এই ৪৮টি প্রস্তাব সম্পর্কে নিজেদের ভোট দিতে পারবেন না। বরং ভোটারদেরকে চারটি বিষয় জানানো হবে। এগুলো হচ্ছে–১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
এমন ব্যালট নিয়ে এখানেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোনো ভোটার এই চারটি বিষয়ের মধ্যে সবগুলোর সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন। কোনো ভোটার দুটি বিষয়ে সম্মতি দিলেও বাকি দুটিতে অসম্মতি জানাতে পারেন। অর্থাৎ তিনি দুটিতে ‘হাঁ’ ভোট আর দুটিতে ‘না’ ভোট দিতে চাইতে পারেন। এই গণভোটে সেই সুযোগ নেই। হয় সবগুলোকে মেনে নিয়ে ‘হাঁ’ ভোট দিতে হবে, নতুবা ‘না’ ভোট দিয়ে সবগুলোকে খারিজ করে দিতে হবে।
ধরা যাক কোনো ভোটার একজন যোগ্য, দক্ষ ও ভালো শাসক ব্যক্তিকে বারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর করার পক্ষে নন। তবে তিনি জুলাই সনদের অন্যান্য প্রস্তাবের সঙ্গে একমত। তিনি কীভাবে তার মতামত দেবেন? জুলাই সনদের এই প্রস্তাবটিতে তো তার ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই!
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভোটাররা জানেনই না জুলাই সনদে কী কী প্রস্তাব করা হয়েছে। কোন কোন প্রস্তাবে সবগুলো রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, কোন কোন প্রস্তাবে একমত হয়নি। বর্তমান সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সেই প্রস্তাবনায় সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে বলা হয়েছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানের ৮(১) ধারাতেও সেটি যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু জুলাই সনদে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে তো সংবিধানের প্রস্তাবনাও বাদ দিতে হবে। তাহলে কি ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক সংগ্রামও বাদ হয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর না জেনে ভোটাররা কী ভোট দেবেন?
শিক্ষিত মানুষের কাছে জুলাই সনদ এখনো এক জটিল বিষয়। আর সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য। আসলে জুলাই সনদ কী-সেটাই জানে না গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ। যে জিনিস জানে না, ব্যালটে তার ভোটও হবে ‘না’। এই ঝুঁকি নিজেই তৈরি করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার।


