ওয়ারেন্ট, অভিযোগ কিংবা কোনো কারণ না দেখিয়েই সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেলকে ডিবির আটকের ঘটনা আবারও একটি দীর্ঘদিনের সমস্যাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকদের হয়রানি, ভয় দেখানো এবং বেআইনিভাবে আটকে রাখা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ডিবি প্রধান যেভাবে একেবারে হেলাফেলায় মধ্যরাতে ‘একটি কথা বলার’ জন্য একজন সাংবাদিককে তুলে আনার নির্দেশ দেন। এমন আলোচনার জন্য রাত পোহানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত না—এই দাবি শুধু হাস্যকরই নয়, বরং আইনের প্রতি উপহাস। সোহেল কোনো অপরাধী নন, পলাতকও ছিলেন না। তবু মধ্যরাতে ডিবির একটি দল তার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে জোর করে নিয়ে যায়।
এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সোহেলকে ডিবি অফিসে টানা দশ ঘণ্টা আটক রাখা হয়। তারপর উদ্বিগ্ন স্ত্রীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। রাতে তার পরিবার কেমন ভয়ে ও অসহায়ভাবে সময় পার করেছে—তা শুধু কল্পনা করা যায়।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাত ১২টার কিছু পর পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি নিজেদের ডিবি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বাড়িতে ঢুকে সোহেলকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। কিন্তু কোনো ওয়ারেন্ট দেখাতে অস্বীকার করেন। এটি পুলিশের আইনগত কাজ নয়, এটি স্রেফ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেখিয়ে অপহরণ।
এক সময় কাউকে ধরে এনে দিনের পর দিন বেআইনীভাবে আটক ও নির্যাতন করতেন সাবেক ডিবি প্রধান হারুন কিংবা মনিরুল। এভাবে সরকারি বাহিনীকে কলঙ্কিত করেছিলেন তারা। বর্তমান ডিবি প্রধানও নির্বিকারভাবে তাদেরকেই অনুসরণ করেছেন। এতে বোঝা যায় একটা আতঙ্কজনক অনিয়ম কিভাবে স্বাভাবিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়ে গেছে।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি এখনো তাজা। ডিবি হারুন রাজনৈতিক নির্দেশে ছাত্রনেতাদের তুলে নিয়ে দিনের পর দিন গায়েব করে রেখেছিলেন। তার আগে মনিরুল নিরপরাধ কিংবা সন্দেহভাজন মানুষকে মাসের পর মাস আটক রেখে পরে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতেন।
সোহেলকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কোনো জরুরি বিষয় ছিল না। ডিবি অফিস থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই থাকতেন তিনি। যদি সত্যিই তার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হতো, তা দিনের বেলা করা যেত। দশ ঘণ্টা আটক রাখাকে নিশ্চয়ই ‘আলোচনা’ বলা যায় না, বরং এটি জবরদস্তি। তাছাড়া ডিবি প্রধান এর কারণ ব্যাখ্যা করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফায়েজ আহমদ তায়্যেব নয়জন মোবাইলফোন ব্যবসায়ীর একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় সোহেলকে আটক করান। তায়্যেব অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু শুধু অস্বীকার করলেই সব সমাধান হয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন সোহেল নিজেই ফেসবুকে এই অভিযোগ করেছেন।
ডিবি প্রধান পরে গণমাধ্যমে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সোহেল নাকি ‘ভুলবশত একটি নিমন্ত্রণপত্রে তার মোবাইল নম্বর লিখেছিলেন’। সেকথা জিজ্ঞেস করতেই তাকে ডেকে আনা হয়েছে। ডিবি প্রধানের এই ব্যাখ্যা অপমানজনক ও অগ্রহণযোগ্য। আবার কোনো কোনো গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘একটি বিষয়’ আলোচনার জন্য সোহেলকে ডেকে নিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই ‘একটি বিষয়’ কী-তা ব্যাখ্যা করেননি। সবশেষে ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝি বলে দাবি করেছেন ডিবি প্রধান, তার এই দাবিও ধোপে টিকছে না।
এদিন সোহেলই একমাত্র লক্ষ্য ছিলেন না। একই রাতে, ভোর ৩টায় মোবাইল বিজনেস কমিউনিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকেও একইভাবে ডিবি তুলে নিয়ে যায় এবং তাকে ১৫ ঘণ্টা আটকে রাখে।
এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বলা যায়, এগুলো কয়েক দশক ধরে চলে আসা সেই একই ধারার অংশ, যেখানে ইচ্ছামতো আটক রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। আইনে স্পষ্ট বলা আছে—নির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায় না। সেই হিসেবে সোহেল ও পিয়াসের আটক ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি।
দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনি শাস্তি না হলে এই নির্যাতনের চক্র ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।


