ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত বিস্তার বাংলাদেশের করব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইকনোমিক সমিতি।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (বিইএ) আরও বলেন, ফেসবুক, মেটা ও গুগলের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো দেশে নিবন্ধিত না হয়েও ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা ও বিজ্ঞাপন থেকে বিপুল আয় কররেও এরা কর কাঠামোর বাইরে থেকে যাচ্ছে।
ফলে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল লেনদেন শনাক্ত ও করের আওতায় আনতে উন্নত ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে আযোজিত প্রি-বাজেট আলোচনায় বিইএ এর পক্ষে এ সব তথ্য তুলে ধরেন মোহাম্মদ মাসুদ আলম।
তার মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য ভৌগোলিক বাজারভিত্তিক করনীতি প্রণয়ন জরুরি, যাতে বাংলাদেশে ব্যবসা করে এমন সব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয়ভাবে কর দিতে বাধ্য করা যায়।
একই সঙ্গে তিনি এনবিআরকে তথ্যনির্ভর (ডাটা-ড্রিভেন) কর প্রশাসন গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে কর ফাঁকি দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
ভারত, মালয়েশিয়া ও এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তিনি এনবিআরকে ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত এবং কর গোয়েন্দা কাঠামোর মাধ্যমে তা ধাপে ধাপে বন্ধ করার পরামর্শ দেন।
কর প্রশাসন শক্তিশালী করতে ভারতের প্যান ও আধার ব্যবস্থার আদলে একটি ‘ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল আইডেন্টিটি সিস্টেম’ চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি।
এতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে ব্যাংক হিসাব, জমির মালিকানা, বাড়িভাড়া ও ইউটিলিটি বিলের তথ্য সংযুক্ত করা হলে আয়ের উৎস ট্র্যাক করা সহজ হবে এবং বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কর ফাঁকি কমবে বলেও মনে করেন তিনি।
উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের করের আওতায় আনতে থার্ড-পার্টি রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, হাসপাতালগুলো যদি চিকিৎসকদের রোগীসংখ্যা রিপোর্ট করে, তবে তাদের প্রকৃত আয় নির্ধারণ সহজ হবে এবং কর আদায় বাড়বে।
কর প্রশাসন আধুনিকীকরণে আর্থিক ফরমগুলোর কাঠামোগত রূপে আনার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমজাতীয় ফরম্যাট চালু হলে সাধারণ করদাতাদের জন্য অনলাইনে কর প্রদান সহজ হবে।
এদিকে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাবের কথাও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে বাজেট নীতি সম্প্রসারণমূলক হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যা অর্থনীতিতে দ্বৈততা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেট ঘোষণার পরপরই মুদ্রানীতি সমন্বয়ের পরামর্শ দেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘ট্যাক্স জাস্টিস’ ভিত্তিক একটি সংস্কার কাঠামো প্রস্তাব করেছে, যার চারটি মূল স্তম্ভ—উন্নয়ন অর্থায়নে সমতা, কর ব্যবস্থার পশ্চাৎমুখীতা হ্রাস, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ এবং সুশাসন জোরদার।
সিপিডির সুপারিশে করপোরেট আয়কর হার বৈশ্বিক ন্যূনতম ১৫ শতাংশের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা, কার্যকর করহার কমানো এবং ফ্ল্যাট প্রণোদনার বদলে কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক প্রণোদনা চালুর কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে ভ্যাট কাঠামো সরল করে তিন স্তরে নামিয়ে আনা এবং মানক হার ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকি রোধে জীবাশ্ম জ্বালানিতে কর সুবিধা প্রত্যাহার, কর অব্যাহতির ওপর সময়সীমা আরোপ, সারা দেশে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) চালু এবং কর নিরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সিপিডির তথ্যমতে, কর ফাঁকির কারণে দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, যেখানে সম্ভাব্য ভ্যাট আয়ের মাত্র ২৮–২৯ শতাংশ আদায় হচ্ছে।
এই অবস্থায় নবনির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার কর-জিডিপি অনুপাত মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন, নীতিগত সমন্বয় এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন সংস্থাটি।


