ট্রেনের টিকিট যুদ্ধ: সুপারিশ, কালোবাজারি আর প্রতারণা

ট্রেনের টিকিট যুদ্ধ: সুপারিশ, কালোবাজারি আর প্রতারণা
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রধান রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে স্টেশন চত্বরে বিরাজ করছে এক চরম অস্থিরতা।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে ট্রেন টিকিটের জন্য ব্যাকুল সবাই। কিন্তু কাউন্টারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ‘সোনার হরিণ’ টিকিট মিলছে না। রেলওয়ের নিজস্ব রেল সেবা অ্যাপেও সকল টিকিট বিক্রি শেষ।

কাউন্টার ও অনলাইন-কোথাও টিকিট না পেয়ে ঘরমুখো হাজারো মানুষ যখন চরম ভোগান্তিতে, তখন রেল কর্তাদের কক্ষে চলছে সুপারিশের মহোৎসব। ফেসবুকে চলছে কালোবাজারি আর প্রতারণা।

অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ঢাকা থেকে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেসের যাত্রী মাজহারুল ইসলাম জানান, পরিবারের পাঁচজন সদস্য পাঁচটি মোবাইল ফোন নিয়ে একযোগে চেষ্টা চালিয়েও কোনোমতে মাত্র একটি টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তার মতে, ঈদের টিকিট পাওয়া এখন রীতিমতো যুদ্ধের শামিল।

একই ধরনের দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা রংপুরগামী যাত্রী জুবায়ের আহমেদের কণ্ঠে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনলাইনে চেষ্টা করেও টিকিট মেলেনি। আবার কাউন্টারে এসেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। কিন্তু প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়া জরুরি, তাই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার বা ‘স্ট্যান্ডিং’ টিকিট কেটেই তিনি যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্টেশনের বাইরেও অসংখ্য যাত্রীকে এমন বাধ্য হয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিটে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে দেখা গেছে।

তবে সাধারণ মানুষের এই হাহাকারের মাঝেই স্টেশন মাস্টার আনোয়ারুল ইসলামের কক্ষের ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে তদ্বিরকারীদের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। ফোনকল আর সুপারিশ নিয়ে আসা মানুষের ভিড়ে কক্ষটির পরিবেশ অনেকটা মাছ বাজারের মতো রূপ নিয়েছে।

আরও পড়ুন

সেখানে আসা কেউ নিজেকে মন্ত্রীর পিএস পরিচয় দিচ্ছেন, আবার কেউ এসেছেন কোনো সচিবের গাড়িচালক হয়ে। প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই-যেকোনো মূল্যে টিকিট নিশ্চিত করা। কাউকে তিনটি, কাউকে পাঁচটি, আবার কাউকে একক কেবিনের টিকিটের সুপারিশ নিয়ে আসতে দেখা যায়।

এ প্রসঙ্গে স্টেশন মাস্টার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সরকারি কাজে ব্যবহারের স্বার্থে দেড় শতাংশ টিকিট বরাদ্দ থাকে। সেই সংরক্ষিত কোটা থেকেই বিভিন্ন সুপারিশের বিপরীতে তারা টিকিট সমন্বয় করে দিয়ে থাকেন।

তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি চাকরি করার কারণে অনেক সময় এমন সুপারিশ রক্ষা না করে উপায় থাকে না।

এদিকে, কাউন্টারে টিকিট সংকটের সুযোগ নিচ্ছে একদল অসাধু চক্র। ফেসবুকে ‘রেলওয়ে টিকিট বাই অ্যান্ড সেল’ নামক বিভিন্ন গ্রুপে ঈদের টিকিট বিক্রির নামে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব গ্রুপে প্রতিটি টিকিটের জন্য নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দাবি করা হয়।

শুধু চড়া দামই নয়, টিকিটের নামে চলছে অভিনব প্রতারণা। নীলফামারীগামী চিলাহাটি এক্সপ্রেসের টিকিট কিনতে গিয়ে এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন আহমেদ জীবন। তিনি জানান, ফেসবুক গ্রুপের একটি নম্বরে যোগাযোগ করলে তার কাছে অগ্রিম ৭০০ টাকা দাবি করা হয়। বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর পরপরই প্রতারক চক্রটি তাকে ব্লক করে দেয়। পরে অন্য নম্বর থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ওই নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সার্বিক এই অব্যবস্থাপনা, কাউন্টারে টিকিটের হাহাকার এবং ফেসবুকে জালিয়াতির বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মো. সাজেদুল ইসলামের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়। তবে তার দপ্তরে টানা চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তার দেখা পাওয়া সম্ভব হয়নি।

যাত্রীদের এই অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা-রাজশাহী রুটের বনলতা এক্সপ্রেসের রেল স্টুয়ার্ড সালমান জানান, ঈদ উপলক্ষে যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কিছু বিশেষ ট্রেনে প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা দুটি অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad