সরকারের কাছে জমা পড়া জুলাই সনদ মেনে নিতে না পারলেও এ নিয়ে কঠোর অবস্থানে যেতে পারছে না বিএনপি। দলটির অনেক নেতাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, এই সনদ বিএনপির বিপক্ষে এবং জামাত ও এনসিপির পক্ষে গেছে। এমনকি সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
তবে ক্ষোভ থাকলেও এখনই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো কর্মসূচিতে যেতে চান না বিএনপির শীর্ষ নেতারা। শেষ পর্যন্ত সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় কিংবা সরকার কী বক্তব্য দেয়, তা দেখেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। সবশেষ মঙ্গলবার রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের নীতিনির্ধারনী ফোরাম স্থায়ী কমিটির ভার্চ্যুয়ালি বৈঠকও প্রসঙ্গটি এসেছে।
বৈঠকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কঠোর সমালোচনা করেন নেতারা। তাদের ভাষায় ঐকমত্য কমিশন যে কাজটা করেছে তা নিছকই ‘প্রতারণা’। জামায়াত ও এনসিপির পক্ষে কমিশন অবস্থান নিয়েছে। এজন্যই বিএনপির সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা হয়নি।
আর গণভোট সম্পর্কে বিএনপির দাবী একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের সুপারিশ না রেখে দুটি বিধানই রেখেছে কমিশন। তারা নির্বাচনের দিন কিংবা নির্বাচনের আগেই গণভোট করতে চায়।
বিএনপি নেতারা বলছেন, একতরফাভাবে কমিশনের এমন কাজে তারা হতাশ, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বুধবার জুলাই সনদ সম্পর্কে বলেছেন, সরকার, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং দু-তিনটি রাজনৈতিক দল একটি পক্ষ। আর বিএনপি আরেক পক্ষ।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এখন দেখা যায় তারা জুলাই সনদে এমন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে, যা জাতিকে বিভক্ত করবে, অনৈক্য সৃষ্টি করবে। এর ভিত্তিতে কোনো ঐকমত্য হবে না।’
তিনি বলেন, ‘তারা কী অর্জন করতে চায়, আমরা জানি না। ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে আমরা হতাশ। দুইটি দলের পক্ষ নেওয়ায় দেশের মানুষও হতাশ হয়েছে।’
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে “নোট অব ডিসেন্ট” পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ঐক্য হতে পারে না। তাহলে এই কমিশন কেন করা হয়েছিল?’
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, ‘জনগণের সঙ্গে এটা একটা প্রতারণা। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এটা প্রতারণা।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টাইমস অব বাংলাদেশকে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জুলাই সনদের সুপারিশে বিএনপির প্রস্তাবনা না রেখে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন ঠিক করেনি। এক ধরনের প্রতারণা করেছে কমিশন।’
বিএনপি সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখব সরকার কী উদ্যোগ নেয়। প্রয়োজনে সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হতে পারে।’
সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো বিশ্বাস আছে সরকার সঠিক সময়ে নির্বাচন দেবে। আর যদি সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে তাহলে সরকারই দায়ী থাকবে।’
বিএনপি নেতারা বলছেন, কেবল জামায়াত ও এনসিপির সুপারিশ থাকলেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে না। দেশে ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশ জুলাই সনদে থাকতে হবে।
জুলাই সনদে নির্বাচনের দিন গণভোট ও নোট অব ডিসেন্ট না থাকায় দল বেশ কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়েছে বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। কারণ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল তার অনেকগুলোই জুলাই সনদে রাখেনি কমিশন।
সরকার যদি সঠিক উদ্যোগ না নেয় তাহলে রাজপথের আন্দোলন নিয়েও বিএনপিকে ভাবতে হবে বলে মনে করেন অনেক নেতা। তবে কোনো আন্দোলন বা সংগ্রামের কারণে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন পিছিয়ে না যায়, সেটাও ভাবছেন তারা। সে কারণেই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যেতে পারছে না।
আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু মিলিয়ে উভয় সংকটেই পড়েছে বিএনপি।
নেতারা আশা করেন, কমিশনের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশ ও প্রস্তাবের বিষয়টি মাথায় রেখে বর্তমান অন্তবর্তী সরকার সঠিক উদ্যোগ নেবে।
অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দিতে হবে। এটাই যথার্থ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। নভেম্বরের মধ্যে গণভোট না হলে জাতীয় নির্বাচনও ফেব্রুয়ারিতে নাও হতে পারে। জুলাই সনদও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।’
এনসিপির নেতা নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী অভিযোগ করে বলেন, গণভোট বানচালের চেষ্টা করছে বিএনপি। তিনি গণভোটের পর জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে।
জুলাই সনদ নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানকে ভিত্তিমূল ধরে মুহাম্মদ ইউনূসের স্বাক্ষরে একটি আদেশ জারি করতে হবে, যার অধীনে গণভোট হবে।’


