জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াত দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে, এক পর্যায়ে দল নিষিদ্ধও করা হয়েছে। বহু মানুষকে আটক রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে।’
মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘জামায়াত যদি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায়, তাহলে শিক্ষিত চোরেরা জনগণের একটি টাকাও চুরি করতে পারবে না। যারা জনগণের প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের কাছ থেকে জনগণের সম্পদ ফিরিয়ে আনা হবে।’
সাতক্ষীরাকে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার জেলা হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘বাংলাদেশের আর কোনো জেলায় সাতক্ষীরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। বুলডোজার দিয়ে নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভাঙা হয়েছে, ৪৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে, অনেকের হাত-পা কেটে দেওয়া হয়েছে। তারা কি কোনো অপরাধ করেছিল?’
২০১৫ সালে সাতক্ষীরায় সফরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি তখন ঘুরতে আসিনি। এসেছিলাম ৪৮ জন শহীদের পরিবারের খোঁজ নিতে, বিধবা মা-বোনদের পাশে দাঁড়াতে এবং যেসব শিশু বাবাকে হারিয়ে অন্ধকারে পড়েছিল, তাদের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব যুবকের হাত-পা কেটে নেওয়া হয়েছিল, তাদের মায়ের চোখের পানি আমি দেখেছি। তারা প্রশ্ন করেছিল–আমাদের সন্তানের দোষ কী ছিল? আমি তাদের বলেছিলাম, একমাত্র “দোষ” ছিল আল্লাহর ওপর বিশ্বাস এবং ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।’
শফিকুর রহমান দাবি করেন, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সাতক্ষীরাকে দীর্ঘদিন পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ ভেবেছিল এই অবস্থা চিরকাল থাকবে। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান সম্মান দেন, আর যাকে চান সম্মান কেড়ে নেন।’
দলের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে–কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। জামায়াত চাঁদাবাজি করেনি, মিথ্যা মামলা দেয়নি। যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলও গত ১৫ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক, আলেম-ওলামা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জুলুমের শিকার হয়েছেন। অনেক সময় জুলুমের শিকার মানুষই পরে জালিম হয়ে ওঠে–এ জন্য ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’
সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের সমর্থন চান জামায়াত আমির। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। যারা দেশের জন্য বেশি সময় ও শ্রম দিচ্ছেন, তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হবে।’
ভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভোট মানে দুটি পথ—“হ্যাঁ” এবং “না”। “হ্যাঁ” মানে স্বাধীনতা, “না” মানে পরাধীনতা।’ তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
যুবসমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা যুবকদের বেকার ভাতা দিতে চাই না। বেকার ভাতা দেওয়া মানে যুবকদের অপমান করা। যুবকরা ভাতা নয়, কাজ চায়। আমরা তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই।’
এ সময় তিনি সাতক্ষীরার চারটি আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরোয়ার, সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম।
এ ছাড়া, ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।


