ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে পরাজয়ের পর দৃশ্যত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদেও (জাকসু) বেশ চাপের মুখে পড়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটগ্রহণের শেষদিকে এসে জাকসু নির্বাচন বয়কট করে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল, তারপরই উল্লাস করতে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন শিবিরের সমর্থকদের। দেশের বড় দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন চিত্র দেখে বোঝা যায় ছাত্রশিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান।
জাকসুতে শিবিরের নাটকীয় উত্থান ও ছাত্রদলের শোচনীয় পরাজয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন জাকসুর সাবেক নেতা ও ছাত্রদল নেতারা। তাদের মতে, জাবিতে তিন দশক ধরে গোপনে রাজনীতি করা ছাত্রশিবির মিশে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বাম ও পেশাজীবি সংগঠনে। তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার ছিলেন। প্রশাসনেও ‘ডুব মেরেছিল’ জামায়াত সমর্থিতরা।
অন্যদিকে ছাত্রদলকে পেছনে টেনে রেখেছে অগোছালো নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল। রাজনীতির মাঠে শিবিরের সঙ্গে না পেরে ওঠার জন্য এসব কারণকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি সংগঠনটি মার খেয়েছে শিবিরের কুটকৌশলের কাছেও।

জাকসু নির্বাচনে গত বৃহস্পতিবার শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ করা হয় ২১টি হলে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি সেদিন। তারপর ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে ছাত্রদলসহ ৫টি প্যানেল নির্বাচন বয়কট করে। তারপর ভোট গণনা তৃতীয় দিনে গড়ালেও শনিবার সকাল পর্যন্ত ফল ঘোষণা করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। হাতে ভোট গণনায় ফলাফল ঘোষণায় দেরি হওয়ার কারণ বলে জানান নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।
জাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের এমন পিছিয়ে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাকসুর সাবেক ভিপি আশরাফ উদ্দিন খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ছিল অগোছালো। অনেক বছর এখানে কমিটি ছিল না। পরে সিনিয়রদের দিয়ে একটি কমিটি দিয়েছে। যার ফলাফল ভাল হয়নি।’
ছাত্রশিবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকে নিজেদের গুছিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে তৈরি করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে ছিল তারা। এমনকি প্রশাসনে তাদের লোক বসানো আছে।’
দখল, চাঁদাবাজিসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে যে ঢালাও অভিযোগ প্রচার করা হয়েছে নির্বাচনে তারও প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন জাবি ছাত্রদলের এই সাবেক নেতা।
ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান কবিরকে গুলিতে হত্যার পর ১৮৮৯ সালে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে জাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। ৩৩ পর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে সেই শিবিরই এগিয়ে রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান অভি জানান, ‘ছাত্রশিবির গুপ্ত সংগঠন। তারা বহু বছর ধরে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রলীগ, বিভিন্ন বাম সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠনে ঢুকে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের তৈরি করেছে।’
জাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাবি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতায় কারচুপির নীলনকশা করে জাকসুর পাতানো নির্বাচন করেছে শিবির। একাধিক ছদ্ম প্যানেল করে প্রার্থী দিয়েছে তারা। ছাত্রী হলগুলোতে শিবিরের একেকজন ৪-৫টি করে ভোট দিয়েছে। অমোচনীয় কালি মুছে গেছে মুহূর্তে।’
জাবি শাখা ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও এবারের জাকসু নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা অনেকের। জাকসু নির্বাচনের প্যানেল ঘোষণার আগে ২৭ আগস্ট স্কাইপিতে দেওয়া ভাষণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই নির্বাচনকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য চ্যলেঞ্জ হিসাবে নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানান। কোন্দল ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশও দেন তিনি।
জাবি ছাত্রদলের আহবায়ক জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেছেন, জাবি ছাত্রদলের কোনো কোন্দল নেই। উপাচার্য ছাত্রদলের অভিযোগ গুরুত্ব দেননি, তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন না।

শিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আরিফ উল্লাহ আদিব বলেন, ছাত্রদল নির্বাচনে আচারবিধি মানেনি। তাদের প্রচারণার ধরণ ও কর্মকান্ড সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভালভাবে নেয়নি। অবস্থা বুঝেই তারা শেষ সময়ে এসে নির্বাচন বয়কট করেছে।
ছাত্রদলের বর্জন প্রসঙ্গে একই প্যানেলের জিএস প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদলের অধিকার আছে ভোট বর্জনের। হয়তো হেরে যাওয়ার থেকে ভোট বর্জন করাই ভালো মনে করেছে তারা।’
জাকসু নির্বাচন যাতে বিতর্কিত না হয় সেজন্য সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান জাবি উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। যারা ভোট বর্জন করেছে তাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শুক্রবার রাতে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’


