দেশজুড়ে ব্যবহারযোগ্য ছোট মূল্যমানের ব্যাংকনোটের ঘাটতির কারণে দৈনন্দিন লেনদেনে ক্রমবর্ধমান বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে শহুরে বাজারগুলোতে ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীরা জানান, ছেঁড়া, জীর্ণ ও অচল নোট এখন ক্রমেই বেশি দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে ছোট মূল্যমানের নতুন নোটের সরবরাহ খুবই সীমিত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তখন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত নোট মুদ্রণ বন্ধ করে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেয়। তবে নতুন নোট এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে আসেনি।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এর প্রভাব তাৎক্ষণিক ও স্পষ্ট। ইস্কাটন এলাকার একটি ফার্মেসির মালিক মো. সবুজ জানান, পাঁচ, দশ ও বিশ টাকার নোটের অভাবে দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি একাধিক ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পর্যাপ্ত খুচরা টাকা পাননি।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে অনানুষ্ঠানিক ও নিম্ন-আয়ের ব্যবসায়ীদের ওপর, যারা ছোট অঙ্কের নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, একটি অচল নোট পেলেই তার সামান্য লাভও নষ্ট হয়ে যায়।
‘আমি যদি একটি নষ্ট নোট পাই, সেটা সরাসরি ক্ষতি হয়ে যায়, কারণ অন্যরা সেটি নিতে চায় না,’ তিনি বলেন।
রাস্তার পাশের বিক্রেতারাও একই সমস্যায় পড়ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সিগারেট বিক্রেতা মাসুদ মিয়া জানান, তিনি যে টাকা পান তার বড় অংশই খুব বেশি জীর্ণ দশ ও বিশ টাকার নোট। অনেক সময় পাইকাররা এসব নোট নিতে চান না, ফলে তাকে ক্ষতি মেনে নিতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে তাদের ওপর, যারা আর্থিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল। ব্যবসায়ীরা জানান, ক্রেতারা অনেক সময় জোর করে নষ্ট নোট চালিয়ে দেন, কিন্তু সেই একই নোট আবার অন্য কোথাও ব্যবহার করতে গেলে তা নেওয়া হয় না—ফলে ক্ষতির এক চক্র তৈরি হয়।
সমস্যা শুধু বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। যাত্রীরা জানান, বাসে নোট গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক হয়, যা দৈনন্দিন বিরক্তি বাড়ায়।
সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২ এপ্রিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ছেঁড়া ও ময়লা নোট বদলে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা এখনো কম।
অনেকে জানান, তারা এই নীতির কথা জানেন না, আবার কেউ কেউ ব্যাংকে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফুটপাতের কিছু ব্যবসায়ী বলেন, তাদের আশঙ্কা—তাদের চেহারা-সুরতের কারণে ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের ভেতরে ঢুকতে দেবে না।
যেখানে এই সেবা পাওয়া যায়, সেখানেও চাহিদা খুব বেশি নয়। কারওয়ান বাজারের ট্রাস্ট ব্যাংকের একটি শাখায় এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে কাউকে নোট বদলাতে দেখা যায়নি, যদিও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, কিছু দিনে অল্পসংখ্যক মানুষ এই সেবা নেন।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, নতুন নোটের সরবরাহ সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বৈশ্বিক বাজারে বিশেষ ধরনের কাগজের ঘাটতির কারণে নতুন নোট উৎপাদন ধীর হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত নতুন নোট তৈরি করতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান।
এই পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ফার্মগেট এলাকার সিগারেট বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি এখন নষ্ট নোট একেবারেই নেন না, যদিও এতে তার বিক্রি কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, নগদনির্ভর এই অর্থনীতি এখন এক মৌলিক কিন্তু বড় সমস্যার মুখোমুখি। টাকার অভাব নয়, বরং এমন টাকার অভাব যা মানুষ ব্যবহার করতে চায় বা পারে।


