পুলিশের বিশেষ অভিযান সত্ত্বেও দেশে হত্যাকাণ্ডের হার এবং অবৈধ ছোট অস্ত্রের অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপ থেকে আসা অত্যাধুনিক পিস্তল, একে-স্টাইল রাইফেল ও ‘পেন গান’ বা কলম-পিস্তলের মতো অস্ত্রের বিস্তার জনমনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, যশোর এবং মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফ রুটসহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ঢুকছে এসব মারণাস্ত্র। সংকট আরও ঘনীভূত করেছে পুলিশ হেফাজত থেকে লুট হওয়া এবং এখনো উদ্ধার না হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলো।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাড়টে অপরাধীদের দিয়ে এসব ঘটানো হচ্ছে, যারা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধের এই ধারা রুখতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা জরুরি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্বাধীন পুলিশ বাহিনী ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। ‘জিরো টলারেন্স’-এর মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং গোয়েন্দা তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরীও মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কৌশল পরিবর্তন করে অপরাধী চক্রগুলোর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে হবে।
বাড়ছে প্রকাশ্য গোলাগুলি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে ১,১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর একটি বড় অংশই প্রকাশ্য গোলাগুলির ঘটনা। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ২২ জন। এছাড়া গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩৮ জনেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কেবল মে মাসেই ১১ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। তদন্তকারীরা বলছেন, এসব ঘটনার মূল কারণ চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক বিরোধ।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই সহিংস প্রবণতাকে স্পষ্ট করে। শনিবার চট্টগ্রামের রাউজানের পাহাড়তলী বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ। তিনি ছিলেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী। এর আগের দিন বিকেলে খুলনার বটিয়াঘাটায় পুলিশের বিশেষ অভিযান চলাকালেই বিএনপি নেতা গাজী রফিকুল ইসলাম ওরফে ঢাকাইয়া রফিককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
একই দিন বিকালে রাজধানী ঢাকার রামপুরায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্লা পলাশের মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। ২৫ বছর কারাদণ্ড খেটে সম্প্রতি মুক্ত হওয়া পলাশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোন্দলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছেন।
অন্যদিকে, যশোর সীমান্ত এলাকায় গত ১৮ মাসে ৬২টি হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে, যেখানে মূলত চোরাই পথে আসা বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে।
চাঁদা না পেয়ে হামলা
চাঁদা না পেয়ে বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও বাড়ছে। গত ১০ জুন রাতে যশোরের অভয়নগরে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী জমির হোসেনের বাড়ি লক্ষ্য করে চার রাউন্ড গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। ২৩ মে রাতে রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে একেবি গ্রুপের মালিক আবুল কাশেমের বাসভবনের প্রধান ফটকে গুলি চালানো হয়; আড়াই মাসের মধ্যে এই বাড়িতে এটি দ্বিতীয় হামলা।
এর আগে ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকার মিরপুরে একেএম অ্যাপারেলস কারখানায় ঢুকে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে একদল সন্ত্রাসী। মালিক অস্বীকৃতি জানালে তারা ফাঁকা গুলি চালায়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি র্যাব।
এমনকি চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে পুলিশি পাহারার মধ্যেই গুলি চালায় পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সহযোগীরা। কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে এই হামলা চালানো হয় বলে দাবি করেন মোস্তাফিজুর।
অবৈধ অস্ত্রের বাজার ও ভাড়া
সীমান্ত দিয়ে আসা চোরাই অস্ত্র বিক্রির পাশাপাশি অপরাধ জগতে এখন অস্ত্রের ভাড়ার বাজারও সক্রিয়। আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরমানি, সিজেড, পিয়েত্রো বেরেটা, তাভোর এবং ৯ এমএম পিস্তলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কালোবাজারে ৭.৬৫ এমএম বা ৭.০৫ এমএম পিস্তলের চেয়ে ৯ এমএম অটোমেটিক অস্ত্রের দাম অনেক বেশি। স্থানীয়ভাবে তৈরি জিপ গান বা সীমান্ত পার হয়ে আসা নিম্নমানের অস্ত্র মিলছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়।
একটি সাধারণ ভারতীয় রিভলভার বা ৭.৬৫ এমএম পিস্তল ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও ৯ এমএম অটোমেটিক পিস্তলের দাম ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। মার্কিন ও ইউরোপীয় নামী ব্র্যান্ডের জাল লোগোযুক্ত বিদেশি পিস্তল হাতবদল হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায়। সূত্র জানায়, অপরাধী চক্রগুলোর কাছে এখনো সামরিক গ্রেডের অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিশাল মজুদ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে ৩৩১ জন। বাড্ডা থেকে মেহেদী হাসান দিপু নামে এক যুবকের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১১টি উচ্চমানের বিদেশি পিস্তল ও রিভলভার, একটি নতুন অটোমেটিক .২২ ক্যালিবারের একে-স্টাইল রাইফেল এবং দুটি এয়ার গান। এ ছাড়া গত ৮ জুন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিয়মিত চেকপোস্টে তল্লাশির সময় এক যুবকের কোমর থেকে ৩টি বিদেশি পিস্তল ও ৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ।


