জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চারজনের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন মনিরুজ্জামান তাজল।
জবানবন্দির একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তার ছেলে মোস্তফা জামান সমুদ্র নিহত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তাজল জবানবন্দি দেন। তার বয়স ৬৬ বছর।
জবানবন্দিতে তাজল জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তার ছেলে সমুদ্র তার সঙ্গে জুমার নামাজ পড়তে বের হন। বাবা ও ছেলে আলাদা মসজিদে যান। সমুদ্র তাকওয়া মসজিদে এবং তিনি মোহাম্মদিয়া মসজিদে নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে ছেলেকে ফোন করলে সমুদ্র জানান, তিনি নামাজ পড়ে বের হয়েছেন।
তিনি বলেন, নামাজ শেষে তিনি বাসার নিচে একটি মিটিংয়ে বসেন। পরে ছেলেকে ফোন করলে সমুদ্র জানান, তিনি ওয়াবদা রোডে জাহাজ বিল্ডিংয়ের কাছে চা খাচ্ছেন। তাকে দ্রুত বাসায় চলে আসতে বলেন তিনি। আনুমানিক বেলা আড়াইটার দিকে সেটিই ছিল ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা।
এরপর বাসায় গিয়ে স্ত্রীকে ভাত দিতে বলেন তাজল। স্ত্রী সমুদ্রের অবস্থান জানতে চাইলে তাকে ফোন করতে বলেন। তার স্ত্রী ফোন করলে সমুদ্র জানান, দুই মিনিটের মধ্যে বাসায় আসছেন। কিন্তু ৮ থেকে ১০ মিনিট পর আবার ফোন করা হলে সমুদ্রের বন্ধু রাফাত ফোনটি ধরেন এবং জানান, সমুদ্র একটু দূরে আছেন।
তাজল জানান, আনুমানিক বেলা ৩টার দিকে তার স্ত্রী আবার ফোন করলে রাফাত জানান, সমুদ্র রামপুরা ডেল্টা হাসপাতালের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাদের দ্রুত যেতে বলেন।
সাক্ষী জানান, তারা ডেল্টা হাসপাতালে পৌঁছান বেলা সাড়ে ৩টার দিকে। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছেন। গুলি তার বাম বাহুতে লেগে পাজর ভেদ করে বুকের ভেতরে চলে যায়। তখন তার স্ত্রী সমুদ্রকে বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন।
তাজল জানান, ডেল্টা হাসপাতাল থেকে হেঁটে বেটার লাইফ হাসপাতালে যেতে পাঁচ মিনিটের মতো সময় লাগে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সমুদ্রকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা তাকে পোস্টমর্টেম করাবেন কি না জানতে চাইলে তিনি তা করবেন না বলে জানান।
এরপর একটি ভ্যানে করে বিকাল ৪টার পর ছেলের লাশ নিয়ে বাসায় ফেরেন তাজল। পরে এলাকার মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন এসে সমুদ্রকে গোসল ও কাফন পরান। সন্ধ্যার পর তার জানাজা হয়। পরে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
জবানবন্দিতে তাজল বলেন, তার ছেলে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ডেল্টা হাসপাতালের কাছে ডিআইটি রোডে গুলিবিদ্ধ হন। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
তাজল জানান, পরে তিনি শুনেছেন, রেদোয়ান, রাফাত, রাশেদ ও মশিউর তার ছেলেকে গুলি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তিনি আরও জানতে পারেন, রেদোয়ান ও রাফাত বিজিবির সদস্য এবং রাশেদ ও মশিউর পুলিশের সদস্য ছিলেন। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরাও ছিল বলে পরে শুনেছেন তিনি।
জবানবন্দিতে তাজল ছেলের হত্যার বিচার চান। এ কথা বলার সময় সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ মামলার দুই আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম, ঘটনার সময় বিজিবিতে ছিলেন। চার আসামির মধ্যে এই দুজনই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন; এ ছাড়া, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান পলাতক।


