সত্তরের দশকের শেষ দিকে পরিচালক আজিজুর রহমান চট্টগ্রামে ‘অশিক্ষিত’ সিনেমার শুটিং করছিলেন। শুটিং বিরতিতে ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা পড়তে গিয়ে একটি খবরে তার চোখ আটকে যায়। ঈদের ছুটিতে স্কুলের বাথরুমে আটকে পড়ে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যুর খবর। মর্মস্পর্শী সেই সত্য ঘটনাটিকে তিনি রুপালি পর্দায় তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু পথটা মসৃণ ছিল না। প্রযোজক খুঁজতে দশজনেরও বেশি মানুষের দরজায় ধরনা দিতে হয়েছিল তাকে। সবার একই উত্তর—একটি ছেলে বাথরুমে মারা গেছে, এতে দেখানোর কী আছে? তখনকার বাজারে নায়ক-নায়িকাপ্রধান মসলাদার ছবির রাজত্ব। এই গল্পে নায়িকার কোনো ভূমিকাই নেই।
শেষ পর্যন্ত সত্য সাহার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘স্বরলিপি বাণীচিত্র’ এগিয়ে আসে। সত্য সাহার স্ত্রী রমলা সাহা প্রযোজক হিসেবে ছবিটি নির্মাণের দায়িত্ব নেন।
মূল ঘটনা নারায়ণগঞ্জের হলেও সিনেমার গল্পে ঢাকার একটি স্কুলে পড়ে বারো বছরের খোকন, পুরো নাম আসাদুজ্জামান খোকন। হাসিখুশি, চঞ্চল এই ছেলেটিকে শিক্ষক ও সহপাঠী সবাই ভালোবাসে। স্কুলের দপ্তরি আব্বাস মিয়ার সঙ্গে তার বিশেষ বন্ধুত্ব।
ঈদের ছুটি আসছে। খোকন মা ও নানাভাইয়ের সঙ্গে ঈদের কেনাকাটা করতে বেরোয়। পথে যাদুকর জুয়েল আইচ–এর শো দেখে অবাক হয় সে। তালাবদ্ধ বাক্স থেকে বেরিয়ে আসার জাদু দেখে সে জানতে চায়, ‘তালাবদ্ধ ঘর থেকেও কি বের হওয়া যায়?’ যাদুকর বলেন—’হ্যাঁ, যেকোনো বন্ধ ঘর বা জেলখানা থেকেও বের হওয়া যায়।’
এই সংলাপটি পরে ছবির সবচেয়ে মর্মভেদী ইঙ্গিতে পরিণত হয়।
সেদিন স্কুলে ঈদের ছুটি ঘোষণা হলো। সবাই হৈচৈ করে বের হয়ে গেল। খোকনকে নিতে গাড়ি আসতে একটু দেরি হলো। অপেক্ষার মাঝে সে বাথরুমে গেল। আর সেই ফাঁকে দপ্তরি আব্বাস মিয়া স্কুলের সব জায়গায় তালা লাগিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। ভেতরে কেউ আছে, তা তিনি টেরই পাননি।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে খোকন দেখল দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। ১১ দিনের ঈদের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। চারপাশে কেউ নেই।
ওদিকে বাড়িতে তখন কান্নার রোল। নানা-নানি এসেছেন নাতিকে নিয়ে গ্রামে যাবেন। কিন্তু ছেলে ফেরেনি। ছেলে হারানোর শোকে খাওয়া ছেড়ে দিলেন মা। পাড়ায় পাড়ায় মাইকিং হলো। সবাই ধরে নিল, এটি ছেলেধরার কাজ। বাথরুমের ভেতর থেকে খোকন সব শুনতে পাচ্ছিল, প্রাণপণে চিৎকার করছিল। কিন্তু কেউ শুনছিল না।
দিন গেল। ঈদ এলো, ঈদ গেল। কলের পানি শেষ হয়ে গেল। দশম দিনে ছোট্ট খোকন আর পারল না।
খোকনের ভূমিকায় শিশুশিল্পী মাস্টার সুমন–এর অভিনয় ছিল অসাধারণ। এর আগেও পরিচালক আজিজুর রহমানের অশিক্ষিত ছবিতে কাজ করেছিলেন তিনি। দপ্তরি আব্বাস মিয়ার চরিত্রে রাজ্জাক এবং ঝাড়ুদার আঙ্গুরি বেগমের ভূমিকায় শাবানা অভিনয় করেন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন সুজাতা, শওকত আকবর ও এটিএম শামসুজ্জামান।
রাজ্জাক পুরো শুটিংজুড়ে লুঙ্গি পরে থাকতেন, চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার জন্য। সঙ্গীত পরিচালক সত্য সাহার সুরে ছবির গান ‘একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব…’ আজও শ্রোতাদের মনে গেঁথে আছে।
শুটিংয়ের স্থান হিসেবে দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শেষে কাপ্তাই বাঁধ এলাকার একটি রেস্ট হাউস বেছে নেন আজিজুর রহমান।
ছবি মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ড আপত্তি তোলে। তাদের আশঙ্কা ছিল, ছবিটি দেখলে কোমলমতি শিশুরা ভয় পাবে।
আজিজুর রহমান তখন একটি চতুর পদক্ষেপ নেন। তিনি একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, যেখানে অভিভাবকদের সঙ্গে প্রচুর শিশুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ছবি শেষে দেখা গেল, কেউ ভয় পায়নি; বরং শিশু-বড় সবাই চোখ মুছতে মুছতে হল থেকে বের হচ্ছে। এরপর মুক্তিতে আর কোনো বাধা রইল না।
ছাড়পত্র পাওয়ার পর নতুন সংকট দেখা দেয়। কোনো সিনেমা হল ছবিটি নিতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২০টি হলে মুক্তি পায় ছুটির ঘণ্টা। এরপর সারা দেশে কোথাও চার-পাঁচ সপ্তাহ, কোথাও এক-দুই মাস, আবার কোথাও পাঁচ মাস পর্যন্ত ছবিটি চলেছে। মুক্তির পর ছবিটি প্রায় চার কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল, যা তখনকার হিসেবে ছিল বিরাট সাফল্য।


