ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ঠিক সেভাবেই নিচ্ছেন, যেভাবে তিনি তার প্রথম বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন–এমনটাই জানিয়েছেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেস। একই সঙ্গে তিনি ৪১ বছর বয়সী এই তারকাকে ‘ফুটবলের জন্য একটি উদাহরণ ও আদর্শ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রতিভাবান একঝাঁক খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত পর্তুগাল দল এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার বা ফেবারিট। তবে মার্তিনেসের দলে রোনালদোর ধারাবাহিক উপস্থিতি একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, তিনি এখনো দলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখছেন কি না।
পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকার ১৪৩টি আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ডের ধারেকাছে কেউ নেই। কিন্তু বড় টুর্নামেন্টগুলোতে নিজের শেষ নয়টি ম্যাচে তিনি কোনো গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া, প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকার সময় রক্ষণভাগকে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও তার অবদান খুবই সামান্য।
মার্তিনেসের চোখে রোনালদো এখনো সেরা
তবে মার্তিনেসের মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, আক্রমণভাগে রোনালদোই এখনো পর্তুগালের সেরা বিকল্প। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযানের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্তিনেস বলেন, ‘তিনি ফুটবলের জন্য একটি উদাহরণ এবং আদর্শ। যেসব শিশু খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করেছে, তাদের জন্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উদাহরণ অনুসরণ করাটা দারুণ ব্যাপার।’
পর্তুগাল কোচ আরও আরও বলেন, ‘এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, কিন্তু আমি অভ্যন্তরীণভাবে বলতে পারি যে, খেলার তীব্রতা, আবেগ এবং দল পরিচালনায় নিজেকে প্রস্তুত রাখার গুরুত্বের দিক থেকে এটিকে তার প্রথম বিশ্বকাপ বলেই মনে হচ্ছে।’
রোনালদোর কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দলের ভেতর তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় কারণ তিনি একজন ফিনিশার, পেনাল্টি বক্সের ভেতরের খেলোয়াড় এবং তার মুভমেন্ট অন্য খেলোয়াড়দের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দিতে পারে। আমাদের আক্রমণাত্মক খেলার ক্ষেত্রে তার পরিসংখ্যানই গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলে।’
সতীর্থদের চোখে অনন্য এক সম্মান
ব্রুনো ফার্নান্দেজ জানান, শৈশবে বড় কোনো টুর্নামেন্ট দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার নিজের দেশের মাটিতেই। যখন ১৯ বছর বয়সী রোনালদো পর্তুগালকে ইউরো ২০০৪-এর ফাইনালে তুলতে সাহায্য করেছিলেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই অধিনায়ক বলেন, ‘জাতীয় দলের আমরা সবাই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খেলা দেখে বড় হয়েছি এবং এখন একই দলে তার পাশে খেলতে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। আমরা সবাই এখানে তাকে সমর্থন করতে এবং পর্তুগালকে যতদূর সম্ভব এগিয়ে নিয়ে যেতে পাশে আছি।’
স্বপ্ন দেখায় তো কোনো বাধা নেই
সদ্য প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পাওয়া ফার্নান্দেজ এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী মাঝমাঠ বা মিডফিল্ডের অংশ। ভিতিনহা এবং জোয়াও নেভেস সম্প্রতি প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। অন্যদিকে বার্নার্ডো সিলভা ম্যানচেস্টার সিটিতে ৯ বছরের ট্রফি-ভরা ক্যারিয়ার শেষ করে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিতে যাচ্ছেন।
পর্তুগাল দলের গভীরতা নিয়ে ফার্নান্দেজ আরও বলেন, ‘আমাদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দল রয়েছে, চমৎকার ব্যক্তিগত দক্ষতা রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং শক্তির বাইরেও আমার মনে হয় আমরা একটি অত্যন্ত সুসংহত এবং ঐক্যবদ্ধ দল। স্বাভাবিকভাবে আমাদের স্বপ্ন সেখানে পৌঁছানো (বিশ্বকাপ জয়) এবং আমার মনে হয় স্বপ্ন দেখায় তো কোনো বাধা নেই।’
কেপ ভার্দের ধাক্কা থেকে সতর্ক মার্তিনেস
‘গ্রুপ কে’-তে পর্তুগালকে আরও মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বকাপে নবাগত উজবেকিস্তান এবং কলম্বিয়ার। তবে মার্তিনেস এখনই ডিআর কঙ্গো ম্যাচ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে বারণ করেছেন; বিশেষ করে নিজেদের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের কাছে স্পেনের ০-০ গোলে ড্র করার মতো ধাক্কা খাওয়ার পর।
এই স্প্যানিশ কোচ বলেন, ‘বাইরে থেকে দেখলে আগামীকালকের ম্যাচে আমাদের পাওয়ার কিছু নেই বললেই চলে। আপনি যদি কঙ্গোর বিরুদ্ধে জিতেন, তবে সেটাই প্রত্যাশিত। যদি এক ওভারে জিতেন, তবে সেটা একটা বড় সমস্যা। যদি ড্র করেন, তবে সেটা একটা বিপর্যয়। আর যদি হেরে যান, তবে সেটা হবে দুনিয়ার শেষ!’
কঙ্গোকে সমীহ করে তিনি আরও বলেন, ‘ওরা কোনো রকম প্রত্যাশার চাপ ছাড়া আসছে, ওরা এখানে থাকাটাই উপভোগ করছে। আমরা কাতার, কেপ ভার্দের মতো দলগুলোর কাছ থেকে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখেছি, যা প্রমাণ করে যে বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ সহজ নয়।’
চুক্তি শেষে দায়িত্ব ছাড়ছেন মার্তিনেস
মার্তিনেস চুক্তি শেষ হওয়ার পর বিশ্বকাপেরই পর্তুগালের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জনও নিশ্চিত করেছেন। তিনি যোগ করেন, ‘বিশ্বকাপের পর আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এটি কোনো খবর নয়, এটি একটি বাস্তবতা মাত্র। আমরা এখন সাড়ে তিন বছর আগে শুরু করা কাজটি সফলভাবে শেষ করার দিকে মনোনিবেশ করছি।’
বিদায়ের আগে নিজের মিশন স্পষ্ট করে কোচ বলেন, ‘আমি যখন পর্তুগালে এসেছিলাম, তখন লক্ষ্য ছিল সবকিছু জেতার চেষ্টা করা, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিশ্বকাপের জন্য দলকে প্রস্তুত করা।’


