চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), হল সংসদ ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট ও ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল।
অভিযোগ জানিয়ে চাকসু নির্বাচন কমিশন বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন জোটদুটির প্রার্থীরা।
বুধবার দুপুর ১টার দিকে ছাত্রদল ও বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ছাত্রশিবির সমর্থিত জোট এই অভিযোগ জমা দেয়।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের বিরুদ্ধে ক্লাস চলার সময়ে প্রচার চালানো, লিফলেট বিতরণ এবং অন্যান্য প্যানেলের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক, উত্তেজনাকর মন্তব্যের অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট। তাদের অভিযোগ, ছাত্রদলের প্যানেল আচরণবিধি ৪(ঙ) এর সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের প্যানেলের বিরুদ্ধে হলের কক্ষে গিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ করেছে ছাত্রদল।
এ বিষয়ে চাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল থেকে দুটি পৃথক অভিযোগ এসেছে। তারা বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমরা কমিশনের সদস্যদের ডেকেছি। তারা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী সাঈদ বিন হাবিব বলেন, ‘আগেও ছাত্রদল আচরণবিধি ভঙ্গ করেছে, কিন্তু আমরা লিখিত অভিযোগ করিনি। চাকসু নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয় এবং সবাই সমান সুযোগ পায়, সেই লক্ষ্যেই আমরা এই অভিযোগ দাখিল করেছি।’
ছাত্রদলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো দেওয়া হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের এলএলএম ক্লাসরুমে অনুষ্ঠিত ২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের ক্লাস চলাকালে আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন (ছাত্রদলের কর্মী) ক্লাসে প্রবেশ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। তিনি ক্লাস চলাকালেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারমূলক বক্তব্য দেন, লিফলেট বিতরণ করেন, এবং অন্যান্য প্যানেলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ও উত্তেজনাকর মন্তব্য। যা চলমান পাঠদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং উপস্থিত শিক্ষার্থীদের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে।
সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট বলছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন আচরণবিধি, ২০২৫-এর ধারা ৪(ঙ) এর সরাসরি লঙ্ঘন। এই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা সমর্থক শ্রেণিকক্ষে, পরীক্ষার হলে, বা পাঠদান চলাকালে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবে না। শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এমন কোনো কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়। তিনি বলেন, ‘এগুলো হাস্যকর অভিযোগ।’
ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে হলে গিয়ে প্রচারণার অভিযোগ
দুপুর ১টার দিকে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের বিরুদ্ধে হলের কক্ষে গিয়ে প্রচার চালানোর অভিযোগ করেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়, শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানসহ অন্যরা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হৃদয় তরুয়া ভবনের (নতুন কলা) তৃতীয় তলায় ইতিহাস বিভাগের ৩৩২৬ নম্বর ক্লাস রুমে ঢুকে শিবির সমর্থিত ভিপি পদ প্রার্থী ইব্রাহিম রনি বুধবার দুপুর ১২টা ১৮ মিনিট থেকে প্রায় ২০ মিনিট নির্বাচনী প্রচারণা চালান। যা স্পষ্টত আচরণবিধির লঙ্ঘন। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুমে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করেন। এটিও আচরণ বিধির লঙ্ঘন।
এসব আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
বিভিন্ন হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদের ছাত্র প্রতিনিধিদের বেশিরভাগই ছাত্রশিবিরের নেতা কর্মী এবং তাদের অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক।
নোমান বলেন, ‘নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ দেখছি না। প্রশাসন একটি গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।’
তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, ‘আমরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে নির্বাচন কমিশন খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘন করিনি।’
এর আগে গত ৫ অক্টোবর শাখা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শাখা ছাত্রীসংস্থার বিরুদ্ধে চাকসু আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়। তবে অভিযোগ নাকচ করে দেয় ছাত্রী সংস্থার নেতারা।
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানের লেখা অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘গত ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীসংস্থার নেত্রীরা ফার্স্ট এইড বক্স বিতরণ করেছেন, যাতে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে। আমরা আরও অবগত হয়েছি ঐ হলের প্রভোস্ট তাদের সহযোগিতা করেছেন। ঐ হলের প্রভোস্ট নির্বাচন কমিশনের সদস্য হয়েও আচরণবিধি লঙ্ঘনে সহযোগিতা করায় উনি নির্বাচনী শপথ ভঙ্গ করেছেন। হল ছাত্রীসংস্থা ও প্রভোস্টের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’
৬ আগস্ট অভিযোগ নাকচ করে নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ছাত্রদলের ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রীসংস্থা।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোটের কার্যনির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘গত আগস্টে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে ছাত্রী হলে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ফার্স্টএইড বক্স দিয়েছিলাম। এটি কোনো নির্বাচনী প্রচারণা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক উদ্যোগের অংশ। কিন্তু ছাত্রদল সেটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।’
ছাত্রদলের অভিযোগের পর নির্বাচন কমিশনের শোকজের জবাব তারা দিয়েছেন এবং কমিশনের নির্দেশে বক্সটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শামসুন্নাহার হলের অন্য ভিপি প্রার্থী শেখ সাদিয়া আচরণবিধি ভেঙে বাদামি রঙের লিফলেট ছাপালেও নির্বাচন কমিশন তা উপেক্ষা করেছে। এ ছাড়া অদম্য শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী ফাইরোজ ফেরদৌসের ফেসবুক আইডি হ্যাক করা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রার্থী তাসমিনকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থী আয়েশা আক্তারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তোলা হয়।
আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় চাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৯০৭ জন। এর মধ্যে চাকসুর ২৬টি পদের বিপরীতে ৪১৫ জন এবং হল সংসদে ৪৮৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


