নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন পরিষদ আয়োজিত শোভাযাত্রাটি শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড় থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর পার্কে গিয়ে শেষ হয়। এতে ঢোল, করতাল, তীর-ধনুকসহ নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সাজে পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ অংশ নেন।
শোভাযাত্রা শেষে জাতীয় সংগীতের পর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক বঙ্গপাল সরদারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নাট্যকলা বিভাগের আলমগীর স্বপন, রাবি ফকলোর অ্যান্ড সোশাল ডেভলপমেন্ট স্ট্যাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্র উপদেষ্টা আমিনুল ইসলাম, আদিবাসী লেখক ও গবেষক মিথু শিলাক মুরমু প্রমুখ।

এ সময় বক্তারা বলেন, ‘ইলা মিত্র ছিলেন কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের মুক্তির প্রতীক। তার নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন শুধু অধিকার প্রতিষ্ঠাই নয়, নারী জাগরণের ইতিহাসেও এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তার সংগ্রামী জীবন ও মানবিক মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।’
একদিকে একই সময় নাচোলের রাওতাড়া ইলা মিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালায় ইলা মিত্রের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। বেলা ১১টার দিকে ইলামিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালা প্রাঙ্গনে ইলামিত্র স্মৃতি সংসদের সভাপতি বিধান শিংয়ের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ‘নাচোলের রাণী’ চলচ্চিত্রের পরিচালক সৈয়দ অহিদুজ্জামান ডায়মন্ড, ইলামিত্র গবেষক ও লেখক আলাউদ্দিন আহমেদ (বটু), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ক্বাফি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি ইসরাইল হক সেন্টু।
আলোচনা শেষে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীর নৃত্য পরিবেশিত হয়। দুপুর ২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী গোম্ভীরা ও নাটিকা পরিবেশিত হয়।

ইলা মিত্রের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয় ইলা সেন। রমেন মিত্রের সঙ্গে বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিয়ে তিনি ইলা মিত্র নামে পরিচিতি লাভ করেন।
নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি ১৯৪৩ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের রমেন মিত্রের বধূ হয়ে ইলা মিত্র বাংলাদেশে আসেন।
পরে তিনি এবং তার স্বামী দুজন মিলে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নবাবগঞ্জ জেলার নাচোলে অনুষ্ঠিত তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। পুলিশ ও সেনারা এই বিদ্রোহ দমন করে। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি সাঁওতাল বেশ ধারণ করে ভারতে যাওয়ার সময় রহনপুর রেলস্টেশনে ইলা মিত্রকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান পুলিশ। কারাগারে তার ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন।
এরপরও আদালতে নির্ভীক চিত্তে ঐতিহাসিক জবানবন্দি দেন এই কিংবদন্তি। কৃষকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ৪ জন পুলিশ নিহত হওয়ায় ইলা মিত্রসহ ২৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে কলকাতা যাওয়ার অনুমতি দেয়। এরপর আর পূর্ব বাংলায় ফিরে আসতে পারেননি ইলা মিত্র।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে তিনি ভারতে ও বিশ্ব পরিসরে জনমত সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে ভারতের পশ্চিবঙ্গে ইলা মিত্র মারা যান।


