চরম অবহেলার কারণে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আবারও দুর্ঘটনা ঘটল মেট্রোরেলে। ফলে প্রাণ হারালেন একজন নিরীহ পথচারী। এর দায় এড়াতে পারে না মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ও রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত প্রতিষ্ঠান–এমন মত বিশেষজ্ঞদের।
রোববার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেটে মেট্রো লাইনের এক শক অ্যাবজরবারের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে আবুল কালাম আজাদ নামে এক পথচারী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই ব্যক্তি এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা।
রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল যোগাযোগ অবকাঠামোতে আবারও এমন ঘটনায় সবার মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
মেট্রোরেল নির্মাণে যে ত্রুটি রয়েছে তা গত বছরের সেপ্টেম্বরের ঘটনাতেই প্রমাণিত হয়। তখনো একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ায় এ অবকাঠামোর সঠিক পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি–এ কথা সামনে আসে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শামসুল হক বলেন, ‘এরপর এমন আর ঘটনার কথা না। কিন্তু ঘটেছে। কারণ, নন-টেকনিক্যাল লোকজন দিয়ে কমিটি করে নামকাওয়াস্তে তদন্ত করা।’
‘নিম্নমানের নির্মাণ হলেও এভাবে পড়ে যাওয়ার কথা না। কারণ, নকশায় নিরাপত্তার সকল ব্যবস্থা থাকা উচিত। এভাবে পড়ে যাওয়ার মানে হচ্ছে নির্মাণে ঘাপলা আছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যাচাই করেই তা গ্রহণ করেছে। কেউই দায় এড়াতে পারেন না,’ যোগ করেন তিনি।
তার মতে, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, গত বছরের মতো এবারও নন-টেকনিক্যাল লোক দিয়ে তদন্ত হবে। কিন্তু বিশদভাবে অডিট করে সঠিক কারণগুলো বের করে যেন আর এমন না ঘটে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি মনে করি না এমন লোকজন দিয়ে তা সম্ভব হবে। ফলে আবার এমনটি ঘটতে পারে।’
২২ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত দেশের প্রথম মেট্রোরেল ব্যবস্থার নির্মাণ, নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণের সকল কাজে জাপানের তিনটি কোম্পানি যুক্ত। তাদের সঙ্গে রয়েছে ইতাল-থাই, ভারতের তিনটি কোম্পানি, যুক্তরাজ্যের একটি এবং বাংলাদেশের একটি কোম্পানি। সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের।
রোববার সাড়ে ১২টার দিকে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের নিচে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সামনের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন আবুল কালাম আজাদ। এ সময় ৪৩৩ নম্বর পিয়ারের বিয়ারিং প্যাড খুলে তার গায়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেল চলাচল চার ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ব্যয়বহুল এ অবকাঠামোর এমন অংশ খুলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় মেট্রোরেল লাইনের নিচ দিয়ে চলা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তবে ট্রেন চলাচল ১১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। গত বছরের যে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল, রোববারের ঘটনাটি তার কাছাকাছি। এদিন ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছে, যা ফার্মগেট স্টেশনের ঠিক পশ্চিম পাশে। গত বছর ৪৩০ নম্বর পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত মোট পিলার আছে ৬২০টি। প্রতিটি পিলারে চারটি করে বিয়ারিং প্যাড রয়েছে।
গত বছরের ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করলেও ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা জানান, তখন থেকেই বিয়ারিং প্যাডের মান নিয়ে পরামর্শককে চিঠি দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ।
মেট্রোরেলের অবহেলার প্রশ্নে ডিএমটিসিএল পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘মেট্রোরেল নিজেই ডিজাইন করেনি। ডিজাইন হয়েছে জাপানি কনসালট্যান্ট দ্বারা এবং নির্মাণও করেছেন জাপানি ঠিকাদার। আমরা মূলত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় জড়িত।’
ঘটনার পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে আরও দুই সপ্তাহ লাগতে পারে।
পরামর্শক হিসেবে জাপানের নিপ্পন কোই ছাড়াও আরও পাঁচটি কোম্পানি যুক্ত রয়েছে। নিপ্পন কোই কোম্পানির বাংলাদেশ শাখার প্রতিনিধি একেএম নুরুল ইসলাম মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আজকের ঘটনাটি প্রমাণ করছে দিনদিন মেট্রোরেল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
তিনি বলেন, ‘আজকের ঘটনা প্রমাণ করল মেট্রোরেলের ডিজাইনে ত্রুটি আছে। এখন আমাদের দ্রুত ডিজাইন অডিট করতে হবে।’ এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা সামনে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
মেট্রো-৬ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চালু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। পরে চালু হয় মতিঝিল পর্যন্ত। প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করেন। তবে শুরু থেকেই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা ধরনের সমস্যা ছিল। এসব কাজে যুক্তদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। প্রায় এক বছরের মাথায় আবার দুর্ঘটনার পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।


