চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
সোমবার বিকালে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) রাসেল।
নিহত বিজিবির নায়েক সুবেদার আব্দুল মোতালেব ডিএডি পদমর্যাদায় র্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনায় আরও কয়েকজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আহত দুইজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। তারা চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
র্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিকালে পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে যায়। অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এছাড়া, ঘটনাস্থলে তিনজন র্যাব সদস্যকে জিম্মিও করে রাখা হয়েছিল। পরে যৌথবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাফর আহমদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে আছি। ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ইয়াছিন বাহিনীর সদস্যদের জঙ্গল ছলিমপুরের ১ নম্বর সমাজ এলাকায় বিএনপির অফিস উদ্বোধন করার কথা ছিল। সেখানেই অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানের খবর শুনেই স্থানীয় ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড বিএনপির আহ্বায়ক কমল কদর জানান, ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। আমরা বর্তমানে নির্বাচনী কেন্দ্রভিত্তিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। জঙ্গল সলিমপুরে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’
সীতাকুণ্ড আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরীর দাবি, জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনায় ইয়াসিন বাহিনী জড়িত। তিনি বলেন, ‘সেখানে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাব সদস্যরা হস্তক্ষেপ করলে ওই সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে একজন র্যাব সদস্য নিহত হন।’
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো হিসেবে পরিচিত ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ।
জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসেবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাসজমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ বাড়তেই থাকে।
এ সময় পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সবশেষ গত বছরের অক্টোবরে জঙ্গল সলিমপুরে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। পরদিন ওই এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় এসব প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।


