এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন, কমে গেছে শিল্পোৎপাদন, কৃষি খাতে সৃষ্টি হয়েছে চাপ। এরই মাঝে হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে শিশু মৃত্যু। এমন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিয়ে জনমনে জন্ম নিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটের তুলনায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখনো যথেষ্ট নয়। তারা সতর্ক করে জানান, পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করতে হলে দ্রুত ও কার্যকরভাবে নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় কারণ দায়ী। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে। এর ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি নিয়ে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংকটের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকার জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা কমলেও সংকট এখনো কাটেনি। উল্টো দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। একই সময়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে দেশে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত শনিবারই সারা দেশে ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই রোগে এখন পর্যন্ত মোট ২৫০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার মধ্যেই জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনাও সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সরকার সমর্থিত ও বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সহিংসতা বেড়েছে। এতে দেখা দিচ্ছে বৃহত্তর অস্থিরতার আশঙ্কা। বিরোধী দলগুলো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন জোরদার করেছে, সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধ নিরসনে ‘মব’ বা গণপিটুনির মতো হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ কমছে না।
জ্বালানি সংকটে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে ৩৬ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নীতি সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দিকনির্দেশনা দেবে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ সদস্যের একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছেন। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি সংকট মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো সমন্বয় করবে।
গত বৃহস্পতিবার সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে তারা বলছেন, এর সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হয় তার ওপর।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, সংকটের গভীরতা স্বীকার করে নেওয়াটাই ছিল প্রথম ধাপ। তিনি জানান, সরকার পরিস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে ব্যাংকিং খাতের মূল সংস্কারগুলো এখনো ঝুলে আছে।
মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, জ্বালানি রেশনিং এবং দাম সমন্বয় করার মতো পদক্ষেপগুলো প্রয়োজনীয় ছিল। তবে এগুলো সাময়িক সমাধান মাত্র।
তিনি বলেন, বারবার এই সংকট এড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজস্ব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো অপরিহার্য। গত এক দশকে এই ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের সতর্কবার্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ
গত বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, জুলাই ও আগস্ট মাসের প্রত্যাশিত রপ্তানি আদেশ স্থগিত হয়ে গেছে। তিনি জানান, আগামী কয়েক মাসের অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে গেছে এবং সামনের দুই-তিন মাসে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী আরও বলেন, ক্রমাগত জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতারা তাদের অর্ডার ভারতসহ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারে সরিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে দেশের শিল্প খাত।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে সংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তেল ও গ্যাসের সংকটের মূল কারণ বৈশ্বিক হলেও দেশীয় সরবরাহের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। তিনি বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহের প্রচেষ্টা জোরদার করার তাগিদ দেন।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চালু করা ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে বর্তমানে ডিজেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে। স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই ধরনের পদক্ষেপগুলো নিয়মিত রাখা প্রয়োজন।
আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আইএমএফ ঋণ ছাড়ের জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে যা অর্থনীতিতে চাপ বাড়াতে পারে। সাম্প্রতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে সেই শর্তেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইএমএফের তহবিল বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, গত দেড় বছরে লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। বাংলাদেশের হাতে শর্তগুলো নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইএমএফের সাথে আলোচনা ভেস্তে গেলে তা বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেবে।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও আইনি জটিলতা
সংস্কার এবং আইন পাসের ক্ষেত্রে কিছু বাধার কারণে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রবর্তিত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। এই অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং পুলিশ কমিশন গঠনের মতো বিষয়গুলো ছিল। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং পৃথক সচিবালয় গঠনের সংস্কার প্রস্তাবও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিরোধী দলগুলো তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। গত শনিবার ঢাকায় জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের নেতারা সতর্ক করে বলেন, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। এই সমাবেশে ‘জুলাই যোদ্ধা’ এবং আন্দোলনে আহত ও তাদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিরোধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার টাইমসকে বলেন, মীমাংসিত সংস্কার বিষয়গুলো পুনরায় সামনে আনা হলে উত্তেজনা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত প্রশাসনের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে সংস্কার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা ছিল। তিনি এই সংকটময় মুহূর্তে পরিস্থিতি উত্তরণে জাতীয় ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দেন।


