গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) বিভিন্ন বিভাগে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিলেও নিয়োগে অনীহা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি)।
গত বছরের ২৯ নভেম্বর নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর একটি চিঠির মাধ্যমে ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায় ইউজিসি এবং কয়েকটি প্রশ্ন করে লিখিত জবাব চায়। ইউজিসির চিঠির পর দিন নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া আটটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ডিনদের নিয়ে লিখিত জবাবসহ ইউজিসিতে হাজির হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গোবিপ্রবির নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া বিভাগগুলোর বিভাগীয় প্রধান, ডিন, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপউপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা সদস্য তানজিম উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি করেন, নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি।
এরপর আড়াই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ইউজিসি। ফলে বন্ধ রয়েছে নিয়োগ কার্যক্রম।
এদিকে, নিয়োগ বন্ধ থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকার পেছনে ইউজিসির উদাসীনতাই দায়ী। তারা মনে করেন, শিক্ষক সংকটে জর্জরিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা ইউজিসির সদিচ্ছার অভাব। নিয়োগে অনিয়ম থাকলে তা এতদিনে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারত ইউজিসি। পাশাপাশি নিয়োগ কার্যক্রম স্বাভাবিক করা যেত।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউজিসি এ পর্যন্ত দুটি চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। প্রথম চিঠিতে ২ ডিসেম্বর নিয়োগ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায় এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগ, বোর্ড সম্পন্ন হওয়ার আগেই রেজল্যুশনে স্বাক্ষর নেওয়া, আর্থিক অনিয়ম, কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী মনোনয়ন, লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের বিধান থাকলেও তা বাতিল করে একাডেমিক ফলাফল, প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিধান করাসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব জানতে চাওয়া হয়, যা পরদিনই পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে ১৯ জানুয়ারি পুনরায় ইউজিসি আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে জানতে চায়, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা না নেওয়ার কারণ, নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সম্মানিত সদস্যদের নামের তালিকা, প্রার্থীদের একাডেমিক ফলাফল, প্রেজেন্টেশন ও ভাইভাসহ পরীক্ষায় প্রাপ্ত মোট নম্বর, বাছাই বোর্ডের সকল সদস্যের স্বাক্ষর সম্বলিত সুপারিশের অনুলিপি এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত। চিঠি প্রাপ্তির পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার জবাব পাঠানো হয়।
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি গোবিপ্রবির নিয়োগ কার্যক্রম উত্তাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি কমিটি করে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে ইউজিসি। কিন্তু এই কমিটির কোনো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কয়েকদিন পর একই তারিখে আহ্বায়ক পরিবর্তন করে পুনরায় আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়।
এদিকে, ইউজিসির চিঠির আলোকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ৭ কর্মদিবস শেষ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এর পেছনে ইউজিসির উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন গোবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টানাপড়েনের ফলে ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
যেখানে ইউজিসিতে বারবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, কয়েকটি বিভাগে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সেখানে এত দীর্ঘ সময় নিয়োগ বন্ধ রাখা ইউজিসির উদাসীনতা ছাড়া আর কিছু নয়।
তাদের মতে, নিয়োগসংক্রান্ত কাজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে অনতিবিলম্বে নিয়োগ কার্যক্রম চালু করা উচিত। দিনের পর দিন এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত রাখা সমীচীন নয়।
এ বিষয়ে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে এবং এটি সহজ তদন্ত নয়। আমরা যে কমিটি প্রথমে করেছিলাম, তার আহ্বায়ক পরিবর্তন করতে হয়েছে, ফলে কাজ যথাযথভাবে শুরু করা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট অনেকদিনের, এটি হঠাৎ করে হয়নি। শিক্ষক ছাড়াই বিভাগ খোলা হয়েছে, যা অপরিকল্পিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগগুলো গুরুতর, বিশেষ করে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়। এসবের সমাধান না করে নিয়োগে অনুমোদন দিলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আমরা বিষয়টি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে চাই। কমিটি কাজ শুরু করেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অভিযোগকারীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। অভিযোগের সুরাহা না করে নতুন নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে যেসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে গোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক হোসেন উদ্দীন শেখর টাইমসকে বলেন, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি, কেবল সুপারিশ করা হয়েছে। রিজেন্ট বোর্ডে উপস্থাপনের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এই পর্যায়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট। বোর্ডে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ মার্কসিট, উপস্থিতি পত্র ও ফলাফল সিটে সই করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষজ্ঞ সদস্যের আপত্তি পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি, এমনকি ইউজিসিও কোনো লিখিত অভিযোগের কপি পাঠায়নি। এই নিয়োগ বন্ধ রাখা ইউজিসির নয়, একজন সদস্যের ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল। বোর্ডে উপস্থিত সদস্যই বলতে পারবেন প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ছিল।’
তিনি বলেন, ‘এক বা দুটি বোর্ড নিয়ে অভিযোগ থাকলেও দীর্ঘদিনের অন্যান্য বোর্ড কেন আটকে রাখা হয়েছে, তা প্রশ্নের বিষয়। ইউজিসির চিঠি পাওয়ার পর আমরা সব বোর্ড স্থগিত রেখেছি, যদিও এটি নির্দেশ নয়, অনুরোধ ছিল। একই চিঠি উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শতাধিক নিয়োগ দিয়েছে। আমরা প্রতিটি চিঠির জবাব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিয়েছি, তাই বিলম্বের অভিযোগও সঠিক নয়।’
এদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগেই সেই অনুপাত নেই। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা গুণগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সেশনজটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে ৫০০ জন শিক্ষক থাকার কথা, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০৪ জন। এদের মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন।


