গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত এবং এক ডজনের বেশি আহত হয়েছেন।
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জিবিতেশ বিশ্বাস জানান, বুধবার বিকেলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। গুলিবিদ্ধ আরও ৯ জনের অস্ত্রোপচার চলছে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন-কোতোয়ালি উপজেলার দীপ্ত সাহা (২৫), রমজান কাজী (২৪), ইমন তালুকদার (২৮) ও সোহেল (৩৫)।
সংঘর্ষের সূচনা ঘটে গোপালগঞ্জ শহরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মিছিল ও সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা হামলা চালানোর মাধ্যমে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন সহিংসতা গোপালগঞ্জে আর দেখা যায়নি। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে শহরের চৌরঙ্গী মোড়, পৌর পার্কসহ বিভিন্ন এলাকায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করে।
পরে রাত ৮টা থেকে ২২ ঘণ্টার কারফিউ ঘোষণা করা হয় সহিংসতা ঠেকাতে। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়।
আমাদের প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রী অনিক রহমান জানিয়েছেন, দুপুর ৩টার দিকে পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতাকর্মীদের বহনকারী গাড়িবহর চৌরঙ্গী মোড়ে পৌঁছালে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা একযোগে হামলা চালায়।
হামলাকারীরা ইটপাটকেল, লাঠিসোঁটা ও ককটেল নিক্ষেপ করে এনসিপির গাড়িবহর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এরপর শুরু হয় খোলা রাস্তায় সংঘর্ষ। সেনাবাহিনী ও বিজিবির সহায়তায় পুলিশ পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং হামলাকারীদের পিছু হটিয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকে, শহরের বিভিন্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এক স্থানীয় দোকানদার বলেন, ‘হঠাৎ রাস্তা ধোঁয়া ও চিৎকারে ভরে গেল। মানুষ দৌড়াচ্ছে, পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ছে, আর অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সেনা-পুলিশ সদস্যরা এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তা দিয়ে কভার দেয়। পরে সাঁজোয়া যান (এপিসি) দিয়ে তাদের জেলা সার্কিট হাউসে সরিয়ে নেয়া হয়।
সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জ সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের কাছে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই হামলা ছিল পরিকল্পিত, ভয় ও সহিংসতার মাধ্যমে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করার অপচেষ্টা।’
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন বিবিসি বাংলাকে জানান, ‘সন্ধ্যা ৫টার পর সেনা-পুলিশের নিরাপত্তায় গোপালগঞ্জ ত্যাগ করেন তারা।’
তিনি জানান, ১৫ থেকে ১৬টি গাড়ির বহর নিয়ে তারা কোদাপাহাড় এলাকা হয়ে গোপালগঞ্জ ছাড়েন। বহরে ছিলেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও উত্তরাঞ্চলের প্রধান সংগঠক সারজিস আলম।
এর আগে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশস্থলে কয়েকশ’আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা লাঠিসোটা, রড হাতে হামলা চালায়। তারা মঞ্চের সাউন্ড সিস্টেম, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে, চেয়ার ভেঙে ফেলে ও স্বেচ্ছাসেবকদের মারধর করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই সময় ককটেল বিস্ফোরণও হয়। পুলিশ শুরুতে পিছু হটে পাশের আদালত চত্বরে আশ্রয় নেয়, এনসিপির নেতাকর্মীরা তখন অসহায় হয়ে পড়েন।
এই হামলা সমাবেশ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তেই ঘটে, এতে পুরো কর্মসূচি ভেঙে পড়ে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জিবিতেষ বিশ্বাস জানান, ১০ থেকে ১২ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বিকালজুড়ে আরও আহতদের হাসপাতালে আনা হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির মুখে জেলা প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করেন।
শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চার প্লাটুন বিজিবি, অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়, সন্ধ্যা পর্যন্ত টহল অব্যাহত ছিল।
গোপালগঞ্জে উত্তেজনা আগের রাত থেকেই বিরাজ করছিল। আলাদা ঘটনায়কে বা কারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়, ভাঙচুর চালায়।
এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তবে প্রশাসনের ধারণা এসব হামলা এনসিপির কর্মসূচি বানচালের সঙ্গে যুক্ত।
উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব, যেখানে দাবি করা হয় এনসিপি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি অশ্রদ্ধা করবে—যা জেলা জুড়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
এনসিপির নেতারা এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করলেও, এসব গুজব সংঘর্ষ উসকে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বুধবারের সমাবেশ ছিল এনসিপির জুলাই কর্মসূচির অংশ, যা ১ জুলাই শুরু হয়। এর উদ্দেশ্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো ও তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থন জোগাড় করা।
দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, ‘১৬ জুলাই: মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ ব্যানারে এই সমাবেশের ঘোষণা। গোপালগঞ্জ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শেষ দুর্গ হিসেবে পরিচিত। সেখানে এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।


