“গুজব বাতাসের আগেই ছড়ায়”— সভ্যতার গত পাঁচশ বছরের ইতিহাস যেন এই প্রবাদেরই এক রক্তাক্ত দলিল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি বদলেছে, গুজবের গতি বেড়েছে, কিন্তু গণসহিংসতা বা ‘মব ভায়োলেন্স’-এর নীলনকশা রয়ে গেছে সেই একই। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যখনই সমাজে কোনো বড় সংকট—তা হতে পারে খরা, মহামারি কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা—তৈরি হয়েছে, তখনই মাথাচাড়া দিয়েছে পুরোনো কোনো সামাজিক ঘৃণা। আর সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে একটি গুজব। সাধারণ মানুষ নিমেষেই রূপান্তরিত হয়েছে এক উন্মত্ত ও হিংস্র জনতায়।
লিসবনের সেই অভিশপ্ত প্রার্থনা
১৫০৬ সাল। পর্তুগালের রাজধানী লিসবন তখন খরা, প্লেগ আর দুর্ভিক্ষে বিপর্যস্ত। মানুষ দিশেহারা হয়ে চার্চে প্রার্থনা করছে বৃষ্টির জন্য। হঠাৎ রটে গেল এক অদ্ভুত গুঞ্জন— “ক্রুশ থেকে অলৌকিক আলো বেরোচ্ছে!” চার্চে উপস্থিত এক ‘নিউ ক্রিশ্চিয়ান’ (জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত ইহুদি) যুক্তিবাদী স্বরে বলে উঠলেন, “এ তো কেবল ল্যাম্পের প্রতিফলন!”
ব্যাস, এই সত্যটুকুই কাল হলো তার। মুহূর্তের মধ্যে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। পরের তিন দিন ধরে লিসবনের রাস্তায় চলল নারকীয় তাণ্ডব। প্রায় ৪০০০ ইহুদিকে পুড়িয়ে ও পিটিয়ে মারা হলো। এই মব সহিংসতার নেপথ্যে লাভবান হয়েছিল স্থানীয় লুটেরা গোষ্ঠী, প্রতিযোগী ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী কিছু ধর্মীয় নেতা। সংকটের দায় একজনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শান্তি খোঁজার এই আদিম প্রবৃত্তি ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
নিরোর রোম থেকে নাৎসি জার্মানি
মব সহিংসতার এই প্যাটার্ন রাষ্ট্রযন্ত্রও ব্যবহার করেছে বারবার। ৬৪ খ্রিস্টাব্দে রোমে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর জনরোষ থেকে বাঁচতে সম্রাট নিরো গুজব ছড়িয়ে দেন, খ্রিস্টানরাই শহরে আগুন লাগিয়েছে। ফলাফল? হাজার হাজার খ্রিস্টানকে ক্রুশবিদ্ধ করে বা জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হলো।
একই চিত্র দেখা যায় ১৯৩৮ সালের জার্মানিতে, যা ‘ক্রিস্টালনাখট’ বা ‘কাঁচ ভাঙার রাত’ নামে পরিচিত। এক ইহুদি তরুণের হাতে এক জার্মান কূটনীতিকের মৃত্যুকে পুঁজি করে নাৎসি প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস রটিয়ে দিলেন— এটি ‘বিশ্ব ইহুদি ষড়যন্ত্র’। পরদিন সংবাদপত্রের শিরোনামে জনতাকে উসকে দেওয়া হলো। এক রাতেই ধ্বংস হলো হাজার হাজার ইহুদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পুড়িয়ে দেওয়া হলো সিনাগগ, আর প্রাণ হারালেন শত শত ইহুদি। রাষ্ট্রীয় মদদে গুজব কীভাবে গণহত্যায় রূপ নেয়, এটি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
রেডিওর শব্দে যখন নেমে আসে মৃত্যু
বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে গুজবের মাধ্যম হলো রেডিও। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার কথা ভাবলে আজও শিউরে ওঠে বিশ্ব। সেবছর ৬ এপ্রিল রুয়ান্ডার তৎকালীন হুতু প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানাকে বহনকারী বিমানটি ভূপাতিত হয়। আজও জানা যাযনি কারা এই বিমান ভূপাতিত করেছিল।
কিন্তু ঘটনার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হুতু নিয়ন্ত্রিত আরটিএলএম নামক রেডিও এবং মিডিয়াগুলো ঘোষণা করে দেয়, টুটসি বিদ্রোহীরাই প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছে। এই একটি মিথ্যা অভিযোগই সাধারণ হুতুদের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শুরু হয় টুটসি গণহত্যা। আরটিএলএম থেকে একটানা প্রচার করা হতে থাকে “টুটসিরা হুতুদের দাস বানাতে চায়।” “তারা আমাদের সন্তানদের হত্যা করবে, তাই নিজেদের বাঁচাতে হলে আগে তাদের শেষ করো।” “টুটসিরা তেলাপোকা, ওদের নির্মূল করো।” এমনকি টুটসিরা কোথায় লুকিয়ে আছে, তাদের নাম-ঠিকানাও প্রচার করা হতো রেডিওতে।
রেডিওর এমন প্রচারে সাধারণ হুতুরাও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সরকারের তৈরি মিলিশিয়াদের সঙ্গে মিলে ধরে ধরে তারা টুটসিদের হত্যা করতে থাকে। মাত্র ১০০ দিনে প্রায় ৮ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয় কেবল একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ানো বিষবাষ্পে।
প্রযুক্তির যুগে হাতের মুঠোয় গুজব
বর্তমানে গুজবের নতুন প্ল্যাটফর্ম সোশ্যাল মিডিয়া। মধ্যযুগে যে গুজব ছড়াতে মাস লাগত, এখন তা ছড়ায় কয়েক সেকেন্ডে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ গুজবটি এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। ফেসবুক আর ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া এই ভিত্তিহীন আতঙ্কে মাত্র দুই সপ্তাহে প্রাণ হারান ৮ জন নিরীহ মানুষ, আহত হন ২২ জন। পরে প্রমাণ হয় ভুক্তভোগীদের কেউই অপরাধী ছিলেন না। কিন্তু উন্মত্ত জনতার হাত থেকে তারা রেহাই পাননি।
কেন মানুষ ‘মব’ হয়ে ওঠে?
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিলোপ। মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিংগারের মতে, ব্যক্তি যখন ভিড়ের অংশ হয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত নৈতিকতা বা বিচারবুদ্ধি কাজ করে না। সে নিজেকে ভিড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে এবং ভাবে— “সবাই করছে, তাই আমি করলেও দোষ নেই।” এর সাথে যোগ হয় বলির পাঁঠা খোঁজার প্রবণতা। নিজের অভাব, হতাশা বা ভয়ের দায় অন্য কোনো দুর্বল বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে মানুষ এক ধরনের পাশবিক তৃপ্তি পায়।
লিসবন থেকে বার্লিন, কিংবা কিগালি থেকে ঢাকা— রূপ বদলেছে কিন্তু মব সহিংসতার কাঠামো বদলায়নি। একটি সংকট, আগে থেকে জমে থাকা ঘৃণা এবং একটি প্রচার মাধ্যম— এই তিনটি উপাদান মিলে তৈরি হয় আধুনিক মব। সভ্যতার এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা অনেক উন্নত হয়েছি ঠিকই, কিন্তু গুজবের পিঠে চড়ে উন্মত্ত হওয়ার এই আদিম অন্ধকার থেকে আজও আমরা বের হতে পারিনি।


