যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশের পর ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ আইন হয়নি। এ সময়ে একাধিকবার খসড়া তৈরি, পর্যালোচনা ও নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। তবে আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০০৯ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির করা রিটের পর হাইকোর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের নির্দেশও দেন আদালত।
মহিলা পরিষদ জানায়, ২০০২ সাল থেকেই তারা যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জনমত গড়ে তোলা হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর মহিলা পরিষদ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইনের খসড়া তৈরি করে। ২০১০ সালে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে খসড়াটি আইন কমিশন ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর, নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা চালানো হয়।
২০২৪ সালের ১ ও ২০ অক্টোবর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অংশীজনদের নিয়ে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সভা হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন পায়। পরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খসড়াটি পর্যালোচনা করে আবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
মহিলা পরিষদ বলছে, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে চললেও নারী ও কন্যাশিশুরা এখনো যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হচ্ছেন। তাই দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।
দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১০ ধারায় উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের সংজ্ঞা হালনাগাদের দাবি জানানো হয়।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা আধুনিকায়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে অভিযোগ কমিটি গঠন এবং কমিটির কার্যক্রম নিয়মিত তদারকের দাবিও জানানো হয়।
যৌন হয়রানি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, পাঠ্যসূচিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত এবং ছেলে-মেয়েদের সচেতন করার সুপারিশ করা হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বারবার বিলম্ব এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা উদ্বেগজনক। নারী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি হলেও তা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নামে আটকে থাকছে।
তিনি বলেন, আইন প্রণয়নে সরকারের দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি করে তা কার্যকর করতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ আইনগত প্রতিফলন জরুরি।
তিনি পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটি, তদন্তের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, নির্দেশনা অমান্যকারীদের জবাবদিহি, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্যাক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামসহ বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


