আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার কার্যক্রমের ধীরগতিতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বিচারের গতি কমে গেছে। অন্তর্বর্তীকালের সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর যেভাবে সাহসিকতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন, বিচার কাজে অগ্রগতি হয়েছিল; সেটাকে তারা থামিয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে বক্তারা এসব অভিযোগ করেন। জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ (এবি পার্টি) ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরাও মানববন্ধনে অংশ নেন।
শহীদ মেহেদী হাসানের মা পারভীন আক্তার নিজের ছেলেসহ সব জুলাই শহীদের হত্যার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি করেন।
তিনি বলেন, সরকার কিছু শহীদ পরিবারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, বাকিদের উপেক্ষা করছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের সন্তানের হত্যার কোনো বিচারই হচ্ছে না। স্যার, আমরা জানতে চাই, আমাদের ছেলেরা জীবন দিয়ে কী অপরাধ করছে?’
১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বিএনপি যদি দলীয় চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ করে এই বিচার কার্যক্রমকে ব্যাহত করা এবং দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিচারকাজ বিলম্বিত করার পথে হাঁটে, জনগণ মনে করবে আপনারা নির্বাচনের মতো বিচার সংস্কারের ক্ষেত্রেও ইঞ্জিনিয়ারিং করছেন।
দলীয় চিফ প্রসিকিউটর দিয়ে বিচারকাজকে যদি ব্যাহত করতে চান, যদি কোনো অশুভ পরিকল্পনা থাকে, এর পরিণতি শুভ হবে না। জনগণ গুম, খুনের বিচার না করে কাউকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেবে না। আপনারা যদি সেই পথে যান, তাহলে আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে যারা আছেন বিশেষ করে দলীয় প্রসিকিউটদের বলতে চাই, জনতার আদালতে আপনাদের বিচার হবে।
তিনি বলেন, অবিলম্বে ফ্যাসিবাদের মূলনায়ক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদের সব দোসরকেও আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, গণহত্যার দায়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে ছোট করে গণহত্যায় অভিযুক্তদের পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমা করার চেষ্টা ও ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে মুক্তিকামী মানুষ চব্বিশের আগস্টের মতো আবার সঠিক জবাব দেবে।
শহীদ সৈয়দ মুনতাসির রহমান আলিফের বাবা গাজীউর রহমান বলেন, জুলাই শহীদেরা পরিবার ও দেশের সম্পদ ছিল। তারা মন্ত্রিত্ব চায়নি, উপদেষ্টা হতে চায়নি। তাদের রক্তের বিনিময়ে অনেকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়েছেন। অথচ সন্তান হত্যার বিচারের জন্য এখন আমাদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হচ্ছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হেলাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির আব্দুল মাজেদ আতহারী, ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য নিয়ামুল বশির, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার।
পরে সাত দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেন ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা। এ সময় জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
সাত দফা দাবিগুলো হলো জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রধান স্থানগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচারে পদক্ষেপ নেওয়া, অভিযুক্ত পুলিশ ও অন্য বাহিনীর সদস্যদের চাকরিতে বহাল না রেখে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা, সব জেলায় নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের অভিযুক্তদের ধরে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণহত্যায় উসকানি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, গুম ও লাশ গুমের সঙ্গে জড়িত সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা, গুমের মামলার ধীরগতি কমিয়ে দ্রুত তদন্ত ও স্বজনদের সুরক্ষা দেওয়া।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। প্রধান প্রধান ঘটনাস্থলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হননি। এমনকি অভিযুক্তদের কেউ কেউ সরকারি দায়িত্বেও বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলেও ঢাকা, রংপুর ও কুষ্টিয়া ছাড়া অধিকাংশ জেলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের অনেক চিহ্নিত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে দাবি করা হয়। এর ফলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া গুম, হত্যা, মরদেহ গোপন ও ধ্বংসের অভিযোগে জড়িত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত দ্রুত শেষ করে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানানো হয়। স্মারকলিপিতে বলা হয়, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণে বিচারপ্রার্থী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


