প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই খুলনায় রাস্তার ওপর বসে অস্থায়ী কাঁচা চামড়ার বাজার। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলে এক সময়ের এই শিল্পনগরীতে এখনো গড়ে ওঠেনি চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষনের কোনো স্থায়ী মার্কেট। ফলে কোরবানির সময় কাঁচা চামড়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
খুলনা শহরের শেখপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি চামড়া কেনাবেচা হতো বলে এলাকাটি একসময় ‘শেখপাড়া চামড়াপট্টি’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে গত ৬-৭ বছর ধরে কাঁচা চামড়া কেনাবেচা বা সংরক্ষণের জন্য কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থায়ী কোনো জায়গা না থাকায় প্রতিবছর ঈদের সময় বাধ্য হয়ে তাদের রাস্তার ওপরেই চামড়া কেনাবেচা করতে হয়। এমনকি চামড়া যাতে পচে না যায়, সেজন্য লবণ লাগানোর প্রাথমিক কাজটিও করতে হয় খোলা সড়কের ওপর। খোলা রাস্তায় এভাবে চামড়া রাখার কারণে একদিকে যেমন এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয় থাকে, অন্যদিকে তেমনি রাস্তায় জটলা তৈরি হয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার ব্যবসায় মন্দা চলছে। ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসান ও ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে ইতিমধ্যে অনেক ব্যবসায়ী তাদের পুরোনো ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর যারা এখনও অনেক কষ্ট করে টিকে আছেন, তারা দ্রুত একটি স্থায়ী বাজার তৈরি এবং সঠিক মূল্যে চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা সিটি করপোরেশনের কাছে তারা বারবার আলাদা চামড়া মার্কেট তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তখন আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের পাশাপাশি চামড়ার জন্য আলাদা বাজার করার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে এবারও কোরবানি ঈদে ব্যবসায়ীদের একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীদের একটি বড় অঙ্কের টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়ৎদারদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন পার হলেও সেই পাওনা টাকা ফেরত না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পুঁজি সংকটে ভুগছেন। এতে নতুন করে চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন তারা।
শেখপাড়া চামড়াপট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী বলেন, “আমরা প্রায় ৩৫ জন ব্যবসায়ী এখানে ১০টির মতো দোকানে চামড়ার ব্যবসা করতাম। কিন্তু বাড়িওয়ালারা চামড়ার দোকান রাখতে রাজি না থাকায় একে একে সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া ট্যানারিতে চামড়া দেওয়ার পরও সময়মতো টাকা না পাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। এখন আমাদের একটি স্থায়ী মার্কেট খুব দরকার। একই সাথে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচার ব্যবস্থা করা হলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।”
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, চামড়া রাখার সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় ব্যবসায়ীরা বর্তমানে চরম বিপাকে পড়েছেন। একসময় এই শেখপাড়া চামড়াপট্টির একটা ঐতিহ্য ছিল, যা এখন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। আগে বড় মহাজন ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা মিলে এখানে প্রচুর ব্যবসা করতেন। অথচ এখন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন ব্যবসায়ী কোনো রকমে টিকে আছেন।
বাজারের এই খারাপ অবস্থার কারণে গত দুই বছর তিনি নিজেও চামড়া কেনাবেচা করা বন্ধ রেখেছেন বলে জানান কার্তিক ঘোষ।
সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম ঢালী বলেন, খুলনার চামড়া ব্যবসা এখন ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় কোরবানির মৌসুমে এখান থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করতেন ৬০-৭০ জন ব্যবসায়ী। আর এখন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী কোনো রকম কষ্ট করে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা সাধারণত বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করে চামড়া কেনেন। কিন্তু ট্যানারিতে চামড়া দেওয়ার পর কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকে, যা আর পাওয়া যায় না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী আজ পথে বসে গেছেন।
খুলনায় আধুনিক কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ মার্কেট গড়ে তোলাসহ চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান আবদুস সালাম ঢালী।
সরকারি তথ্যসূত্রে জানা গেছে, গত বছর কোরবানি ঈদে খুলনা জেলায় মোট ২২ হাজার ৭৪২ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এই সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, চামড়া ব্যবসায়ীরা যদি চামড়ার মার্কেটের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে জানান, তবে সিটি করপোরেশন অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।


