গ্রামের শান্ত পাকা সড়ক ধরে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন শতাধিক মানুষ। গন্তব্য স্থানীয় এক ‘পীর’-এর আস্তানা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিছিলকারীরা সেখানে পৌঁছে শুরু করেন তাণ্ডব। ভাঙচুর শেষে পাকা ঘরে ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৯ মিনিটের একটি ভিডিওতে ধরা পড়েছে এমন দৃশ্য। শনিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘পীর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর আগের একটি ভিডিওতে শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ভিডিওটি শুক্রবার সকাল থেকে পুনরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
শনিবার সকালে আস্তানা থেকে কিছুটা দূরে ‘আবেদের ঘাট’ এলাকায় জড়ো হন স্থানীয় শতাধিক মানুষ। জোহরের নামাজের পর লাঠিসোঁটা, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে আসা বিক্ষুব্ধ জনতা আস্তানায় হামলা চালায়। আধা ঘণ্টাব্যাপী চলা এই তাণ্ডবে আস্তানায় থাকা বেশ কয়েকজন আহত হন এবং প্রাণভয়ে অনেকে পালিয়ে যান।
আহত অবস্থায় তিনজনকে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে শামীম রেজা মারা যান। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার মৃত্যু হয়। আহত অন্য একজন নারী ও পুরুষ বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিত থাকলেও হামলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে কারা এবং কীভাবে পুরোনো ভিডিওটি নতুন করে সামনে নিয়ে এল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান জানান, ধারণা করা হচ্ছে আস্তানার পেছন দিকের বাঁশবাগান দিয়ে সহস্রাধিক মানুষ এসে অতর্কিত এ হামলা চালিয়েছে।
শামীম রেজা ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাস করার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন। চাকরি জীবন শেষে কেরানীগঞ্জের এক পীরের সান্নিধ্যে আসেন এবং ২০১৮ সালে নিজ গ্রামে পৈতৃক জমিতে আস্তানা গড়ে তোলেন।
২০২১ সালে এক শিশুর মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফন করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। সেই সময় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর মুক্তি পান।


