কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি যাত্রীবাহী টার্মিনালে ড্রোন হামলায় এক ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন যাত্রী ও শ্রমিকসহ ৬৩ জন। কুয়েতের ভারতীয় দূতাবাস নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের নজরদারি ফুটেজে দেখা গেছে, একটি ত্রিভুজাকৃতির ডেল্টা-উইং ড্রোন সরাসরি টার্মিনালে আছড়ে পড়ছে। এই হামলার পেছনে ইরানকে দায়ী করেছে কুয়েত ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় সময় বুধবারের হামলায় বিমানবন্দরটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য সেখানে বাণিজ্যিক বিমান উড্ডয়নও বন্ধ রাখা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলায় কুয়েতের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঘটনা দুই দেশের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৌদ আব্দুল আজিজ আল-ওতাইবি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি শত্রুড্রোন’ বিমানবন্দরের একটি যাত্রীবাহী ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর কয়েক মাস বন্ধ ছিল বিমানবন্দরটি। গত সোমবারই এটি চালু হয়েছিল।
ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস দাবি করেছে তারা বিমানবন্দরে কোনো হামলা চালায়নি। এই দাবির পক্ষে অবশ্য কোনো প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন তারা।
আইআরজিসি জানায়, মার্কিন ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরোধক) ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রকে আঘাত করতে ব্যর্থ হওয়ায় টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য এই দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছে। এক এক্স পোস্টে তারা জানিয়েছে, ইরানি ড্রোনগুলো বিমানবন্দরের ওপর ‘সুচিন্তিত, পরিকল্পিত ও অযৌক্তিক হামলা’ চালিয়েছিল।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা ইরান থেকে আসা এক ডজনেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও সমসংখ্যক ড্রোন ধ্বংস করেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইটগুলো একটি ভিন্ন টার্মিনালে আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হয়েছে। অন্য কোনো ফ্লাইট চলাচল করছে না। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলা মেনে নেওয়া হবে না জানিয়ে দুজন ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন মধ্যস্থতাকারীরা। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ফেরার আগে ইরান লেবাননে আলাদা যুদ্ধবিরতি চায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টিকরা ইরানি জাহাজ ও সামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বহাল আছে কি না জানতে চাইলে বুধবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর বেশ কড়া আঘাত হানছি। বিশ্বের ওই অংশে যুদ্ধবিরতির অর্থ- যখন আপনি আরও সংযতভাবে গুলি চালান।’
অন্যদিকে লেবানন চলমান সংঘাত নিয়েও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ইসরায়েলকে সংযম প্রদর্শনের চাপ দিচ্ছে।
ট্রাম্পও স্বীকার করেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতে এক ফোনালাপে তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেছিলেন। তা সত্ত্বেও উভয় নেতা দাবি করেছেন তাদের সুসম্পর্ক অটুট রয়েছে।
ইরান বিশ্বের তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম চড়া। ওয়াশিংটনে হাউস স্পিকার মাইক জনসন জানান, গত সোমবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। সেখানে বাণিজ্য প্রবাহ সচল করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
নেতানিয়াহু মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-কে বলেন, ইরান ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। তবে সামরিক প্রতিক্রিয়া বাড়ানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের হাতে থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্স-এ ঘোষণা করেছেন, ‘যেকোনো প্রতিকূল কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক ও চূড়ান্ত জবাব দেওয়া হবে।’
মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের একটি ইরানি সামরিক স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ ও যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী পঁচিশ বছরের মধ্যে লেবাননের সবচেয়ে গভীরে প্রবেশ করেছে। হিজবুল্লাহও রকেট ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। লেবাননে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর রয়েছে। কোনো পক্ষই সেনা প্রত্যাহার করেনি। ইরান চায় যেকোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে লেবাননের লড়াই বন্ধ হোক। নেতানিয়াহু দুটি বিষয় আলাদা রাখতে চান। আসন্ন শরতের নির্বাচনের কারণে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোর জন্য তার ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ রয়েছে।


