কিশোরগঞ্জে আসন্ন মৌসুমের জন্য সরবরাহ করা ব্রি ধান-৪৯ জাতের সরকারি আমন ধানের বীজে জ্যান্ত পোকা ও পোকায় খাওয়া ধানের গুঁড়ো পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বীজ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)।
বিএডিসি কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের বীজ বিপণন বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন গত ৩ জুন কর্তৃপক্ষকে এক চিঠিতে পোকাযুক্ত বীজের কথা জানান। চিঠিতে তিনি জানান, ২০২৬-২৭ বিতরণ বছরের জন্য বিএডিসির উৎপাদন বিভাগ থেকে ব্রি ধান-৪৯ জাতের ১০ টন বীজের প্রথম চালান আসে। পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা বীজের মধ্যে জ্যান্ত পোকা ও পোকা খাওয়া ধানের গুঁড়ো দেখতে পান।
এই পোকা আক্রমণের ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে চিঠির সঙ্গে পাঠানো হয়। বীজ বিতরণ ব্যবস্থায় যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য তিনি অবিলম্বে পোকাযুক্ত বীজ বদলে নতুন ও ভালো বীজ সরবরাহের অনুরোধ করেন।
বিএডিসি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, ডিলাররা ইতোমধ্যে আমন মৌসুমের বীজ নেওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছেন। এই অবস্থায় পোকাযুক্ত বীজ বিতরণ করা হলে কৃষক ও ডিলার উভয়ের জন্যই বড় জটিলতা তৈরি হবে।
গোলাম মোস্তফা নামের একজন বীজ ডিলার অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে সব প্রক্রিয়া শেষ করার পরও ডিলারেরা চাহিদা অনুযায়ী বীজ পাচ্ছেন না। বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা ১৫ থেকে ১৬টি জাতের বীজের মধ্যে প্রধান দুই-তিনটি জাতের বীজ এখনো পাওয়াই যাচ্ছে না। বীজ সংগ্রহের জন্য বারবার বিএডিসি অফিসে আসার কারণে তাদের পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গোলাম মোস্তফা আরও বলেন, এখন কৃষকদের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময় চলছে। কিন্তু তারা প্রয়োজনীয় বীজ পাচ্ছেন না। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বীজ কিনছেন। এর ফলে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
খোরশেদ আলম নামের আরেকজন ডিলার বলেন, গত ১ জুন বীজ সরবরাহ করার কথা ছিল, কিন্তু তা এখনো আসেনি। পরে ডিলাররা জানতে পেরেছেন, উৎপাদন বিভাগ থেকে পাঠানো বীজে পোকা পাওয়া গেছে। কৃষকেরা সময়মতো বীজ না পেলে অবশ্যই বিকল্প উৎসের দিকে চলে যাবেন।
মাসুম বিল্লাহ নামের অন্য এক ডিলার বলেন, আমন দেশের অন্যতম প্রধান একটি ফসল। কোনো অবস্থাতেই কৃষকদের কাছে এমন নিম্নমানের বা নষ্ট বীজ বিতরণ করা ঠিক হবে না।
বিএডিসির বিপণন বিভাগের সহকারী উপ-পরিচালক ফাতেমা নাসরিন জানান, ৩ জুন চালানটি আসার পর পরিদর্শনে জ্যান্ত পোকার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর ফলে ডিলাররা এই বীজ নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ডিলারদের বীজ দিতে দেরি হলে পুরো চালানটিই অবিক্রীত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো লাভবান হবে, বিএডিসির সুনাম নষ্ট হবে এবং সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে।
তিনি আরও বলেন, যেসব ডিলার টাকা জমা দিয়ে রসিদ নিয়েছেন, তারা বীজের জন্য প্রতিদিন অফিসে এসে চাপ সৃষ্টি করছেন।
বিএডিসি কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, ব্রি ধান-৪৯ একটি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন জাত। উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আসা ১০ টনের চালানে পোকা ধরা পড়েছে। তিনি আরও জানান, পোকাযুক্ত বীজ স্প্রে এবং গ্যাস প্রয়োগের মাধ্যমে শোধন করা সম্ভব। তবে দীর্ঘদিন পোকা আক্রান্ত থাকলে বীজের গজানোর ক্ষমতা এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বীজগুলো চুক্তিভিত্তিক চাষিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করার কথা থাকলেও চালানের একটি অংশ অন্য উৎস থেকে কেনা হয়েছে। এ কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ডিলারদের মনে তৈরি হয়েছে সন্দেহ ও উদ্বেগ।
বিএডিসি সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের জন্য প্রায় ৯০০ টন আমন বীজ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১৩ টন হচ্ছে ব্রি ধান-৪৯ জাতের বীজ। এই ৩১৩ টনের মধ্যে কিশোরগঞ্জ উৎপাদন বিভাগের ২২০ টন বীজ সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
বিতরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বীজ দিতে না পারলে চলতি মৌসুমে সরকারের প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হতে পারে।
এসব অভিযোগের পর বিএডিসি কিশোরগঞ্জ উৎপাদন বিভাগের গুদামে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত বীজগুলো আবার বাছাই করে নতুন করে প্যাকেটজাত করছেন।
বিএডিসি কিশোরগঞ্জ উৎপাদন বিভাগের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, বীজে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। তবে বীজগুলো আবার বাছাই করার কারণে এখন পোকার উপদ্রব দূর হয়েছে। বর্তমানে যে বীজগুলো পুনরায় প্যাকেটজাত করা হচ্ছে সেগুলোর অঙ্কুরোদগমে কোনো সমস্যা হবে না এবং এগুলো বিতরণের জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী বলে দাবি করেন তিনি।


