কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের দ্রুত প্রসার ঘটছে। বঙ্গোপসাগরের নীল আকাশে এখন রঙিন সব প্যারাশুট উড়তে দেখা যায়, যা কক্সবাজারকে একটি সাধারণ সমুদ্রসৈকত থেকে ক্রমশ অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের কেন্দ্রে পরিণত করছে।
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে প্যারাসেইলিং অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ এর মাধ্যমে সমুদ্র উপকূলের এক নয়ন মনোহর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তবে সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনা এই খেলার নিরাপত্তা ও নিয়মকানুন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্যারাসেইলিং হলো এমন একটি খেলা যেখানে অংশগ্রহণকারীকে প্যারাশুটের সাথে বেল্ট দিয়ে বেঁধে দিয়ে স্পিডবোটের সাহায্যে টেনে নেওয়া হয়। ফলে পর্যটক সমুদ্রের অনেক উঁচুতে উড়তে থাকেন। আকাশ থেকে দেখা যায় সমুদ্র, সৈকত এবং কাছের পাহাড়ের প্যানোরামিক বা বিস্তৃত দৃশ্য। ব্যবসায়ীরা এটিকে একইসাথে রোমাঞ্চকর এবং শান্ত একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রচার করেন। অনেক পর্যটকের কাছেই এখন কক্সবাজার ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্যারাসেইলিং।
তবে সাম্প্রতিক কিছু দুর্ঘটনার পর উদ্বেগ বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে দরিয়া নগরের কাছে একটি প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় একজন পর্যটক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঝাউ গাছে আটকে পড়লে বিষয়টি জনসমক্ষে আসে। যদিও এতে কোনো গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি, তবুও এই ঘটনার পর জেলা প্রশাসন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশের সৈকতে প্যারাসেইলিং কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। একইসাথে নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারেও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালে আরেকজন নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং করার সময় আহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে কক্সবাজারের একটি আদালত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মান ঠিক আছে কি না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করেছিল।
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্যারাসেইলিংয়ের আকর্ষণ কমেনি। পর্যটকরা এই অভিজ্ঞতাকে যেমন রোমাঞ্চকর বলছেন, তেমনি ভয়ংকর হিসেবেও বর্ণনা করছেন। চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক ইশিতা সম্প্রতি প্যারাসেইলিং করেছেন। তিনি জানান, আকাশে উড়ার বিষয়টি তিনি দারুন উপভোগ করেছেন। তবে তার পা যখন সমুদ্রের পানি স্পর্শ করছিল, তখন তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন যে হয়তো পড়ে যাবেন। তার স্বামী মইন উদ্দিন সৈকত থেকে সব দেখছিলেন। স্ত্রীর দীর্ঘদিনের শখ পূরণ হতে দেখে তিনি বেশ খুশি।
প্যারাসেইলিং ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই খাতটি কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’-এর মালিক ফরিদুল আলম জানান, বর্তমানে জেলায় পাঁচটি সক্রিয় প্যারাসেইলিং পয়েন্ট রয়েছে। মাঝেমধ্যে বিধিনিষেধ থাকলেও এর চাহিদাও বেশ ভালো।
কেবল কক্সবাজারই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র যেমন থাইল্যান্ডের পাতায়া এবং ভিয়েতনামের দা নাং-এও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। সেসব দেশে এর ফলে নিয়মকানুন ও তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে।
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এর সঠিক তদারকির ওপর। সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই স্বীকার করেন, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়াতে আরও স্পষ্ট নিয়মকানুন, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। প্যারাসেইলিং যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে, তেমনি নিরাপত্তার সাথে এই প্রসারের ভারসাম্য বজায় রাখা গেলেই অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম খাতে এটি টিকে থাকতে পারবে।


