দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সংবাদপত্রের মালিকরা যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ বিভাজন সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক চাপ, ভয়ভীতি এবং জনরোষের মুখে ক্রমেই আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলছে।
গত শনিবার ঢাকায় আয়োজিত প্রথম ‘মিডিয়া কনভেনশন ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, থেমে থাকা সংস্কার এবং আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা সংবাদকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এর ফলে নিউজরুমগুলো দীর্ঘস্থায়ী হুমকির মুখে পড়ছে।
সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছিল নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং সম্পাদক পরিষদ। এটি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর বারবার আসা আঘাতের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। টেলিভিশন মালিক, জাতীয় প্রেস ক্লাব, সাংবাদিকদের সংগঠন এবং ফটোসাংবাদিকদের গ্রুপসহ গণমাধ্যমের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এতে অংশ নেন, যা অনুষ্ঠানটিকে এই পেশার একটি বিরল এবং সর্বজনীন সমাবেশের রূপ দেয়।
সম্মেলনে অনেক বক্তা যুক্তি দেখান, সংবাদমাধ্যম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা সতর্ক করেন, বিভক্ত সংবাদমাধ্যম সহজেই দমনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাদের মতে, একটি মুক্ত, স্বাধীন এবং ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যম একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য অপরিহার্য—যা রাজনৈতিক শক্তি এবং সকল অংশীজনদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। প্রায় সব মতাদর্শের সাংবাদিকদের একত্রিত করে এমন একটি সম্মেলন আয়োজন করতে পারাটাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি ছিল দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এবং সঠিক দিশায় একটি পদক্ষেপ। মঞ্চে যেসব মূল নীতির কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নেই।
তবে সম্মেলনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, নয়তো একেবারেই আলোচনা করা হয়নি। এর মধ্যে অন্যতম সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা। শারীরিক নিরাপত্তা এবং নিউজরুমের ওপর হামলা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও, বাংলাদেশে এই পেশার সাথে জড়িয়ে থাকা আর্থিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি খুব সামান্যই গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা সরাসরি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংবাদপত্র ও নিউজ এজেন্সির সাংবাদিকদের জন্য ২০১৯ সালে নবম ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু শনিবারের অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক নোয়াবের আইনি চ্যালেঞ্জের কারণে তা কখনোই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক সাংবাদিক এখনো ২০১২ সালে ঘোষিত এবং ২০১৩ সালে বাস্তবায়িত অষ্টম ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন। গত ১৩ বছরের মুদ্রাস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরির মান মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়া নির্ভীক ও মানসম্মত সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করা অবাস্তব।
এছাড়া টেলিভিশন চ্যানেল বা অনলাইন পোর্টালগুলোর জন্য কোনো ওয়েজ বোর্ডই নেই। খবর অনুযায়ী, রাজধানীর মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বেতন দেয়। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। এমনকি সম্মেলনে অংশ নেওয়া কিছু বক্তা এমন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন যাদের বিরুদ্ধে কর্মীদের বেতন সময়মতো না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বকেয়া বেতনের দাবিতে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বাধার মুখে পড়া এক সম্পাদকও সম্মেলনে বক্তৃতা করেছেন।
সাংবাদিকদের ঐক্যের বিষয়টিও রাজনীতির কারণে জটিল হয়ে পড়েছে। আয়োজকরা সাংবাদিকদের সব সংগঠনের প্রতিনিধিত্বের কথা বললেও সেখানে মূলত বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত সংগঠনের সাংবাদিকদের উপস্থিতিই দেখা গেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত হিসাবে পরিচিত সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এটা সত্য যে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাংবাদিকের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই বেশি সক্রিয় ছিলেন। তবে অন্য অনেকে নির্দিষ্ট আদর্শ সমর্থন করলেও সাংবাদিকতার মান বজায় রেখেছিলেন। তাদেরকে বাদ দেওয়া সেই ঐক্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা এই সম্মেলন গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
সম্মেলনে কিছু দ্বিমুখী আচরণও লক্ষ্য করা গেছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে কথা বললেও, অন্তত একজন বক্তা বর্তমানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন। অন্য এক বক্তা সাংবাদিকদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানালেও তিনি নিজে অন্য একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থবহ সংস্কার চাইলে এই বৈপরীত্যগুলোর মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নির্বাচন এখন পেশাদারিত্বের বদলে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকরা যদি ব্যক্তিগত বা পেশাগত লাভের জন্য রাজনৈতিক সম্পর্কের ব্যবহার করা বন্ধ করতেন, তবে এই শিল্পটি অনেক দ্রুত নিজেই নিজের সংস্কার করতে পারত।
সাংবাদিকদের আইনি হয়রানির বিষয়টিও সম্মেলনে সেভাবে আসেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর থেকে অনেক সাংবাদিককে এমন সব মামলায় জড়ানো হয়েছে যেগুলোকে সমালোচকরা হাস্যকর বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করছেন। কিছু সাংবাদিক নিঃসন্দেহে পেশাদারিত্বের মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো স্বৈরতন্ত্রকেও সহায়তা করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে হত্যা বা অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের অভিযোগ আনা আইনের শাসনের উপহাস মাত্র। কারো মত বা কাজের সাথে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংশ্লিষ্টতা নেই এমন ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে তাদের শাস্তি দেওয়াটা সমর্থনযোগ্য নয়। এমনকি গুরুতর সহিংস অপরাধের আসামিরা জামিন পেলেও কোনো কোনো সাংবাদিক এখনো জামিন না পেয়ে কারাগারে আছেন।
মাত্র একজন বক্তা সরাসরি এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। সাংবাদিকরা যাতে তাদের মতামতের জন্য নয়, বরং কেবল প্রকৃত অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন হন— এই সম্মেলন সেই নীতিটি রক্ষা করার সুযোগ হারিয়েছে। সমালোচকদের মতে, যদি ঐক্যই প্রকৃত লক্ষ্য হয়, তবে মূলনীতি হওয়া উচিত: “সবার জন্য এক, আর একের জন্য সবাই”। তবে প্রকৃত অপরাধী বা অনৈতিক আচরণের জন্য কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
দেশটির দুটি প্রধান সংবাদপত্রের ওপর হওয়া দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে নিন্দিত সহিংস হামলার প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন আয়োজন করা হয়। তবুও এক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। ‘নয়া দিগন্ত’ বা ‘আমার দেশ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর হওয়া হামলাগুলো একই পর্যায়ের ক্ষোভ তৈরি করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যম শিল্পকে যদি একটি একক সত্তা হিসেবে কাজ করতে হয়, তবে প্রতিটি সাংবাদিক বা নিউজরুমের ওপর হওয়া হামলাকে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
এখানে কোনো ‘সুবিধাবাদী সমঝোতা’ বা ‘বেছে বেছে সংহতি’ জানানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। আদর্শ এবং সম্পাদকীয় নীতিতে ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। তবে নিরাপত্তা, অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতার প্রশ্নে পুরো শিল্পকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।
পরিশেষে, দেশের সাংবাদিকতা সাংবাদিকদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবে—রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা কোটিপতিদের মাধ্যমে নয়। তবেই এটি ক্ষমতার হাতিয়ার না হয়ে একটি প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক পেশা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। মিডিয়া কনভেনশন ২০২৬ হয়তো একটি নতুন যাত্রার সূচনা করেছে। তবে এটি কোনো মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হবে কি না, তা নির্ভর করবে এই পেশাটি রাষ্ট্রের মতো নিজের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলোকেও সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে ইচ্ছুক কি না তার ওপর।


