প্রতিমন্ত্রীর সন্তান আর পৈতৃক বাড়ির নামে ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মাঝেই এবার একটি বিদ্যালয়ের নাম বদলানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী বিদ্যালয়টির নতুন নাম ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শিবগঞ্জ, বগুড়া’ করার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি শিবগঞ্জ উপজেলার একমাত্র পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি চিঠি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখা থেকে গত ৯ জুন জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার।
চিঠিতে বলা হয়, বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সেই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় মতামত ও সুপারিশ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ১৩ জুলাই ২০২৩ তারিখে জারি করা ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত-২০২৩)’ এর অনুচ্ছেদ ১৪.৫ অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং স্থানীয় জনমতের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত ও সুপারিশ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহীর চেয়ারম্যান এবং বগুড়ার জেলা প্রশাসককে পৃথকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের তদন্ত, মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নতুন ইউনিয়নের নামকরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম নির্ধারণ নিয়ে জাতীয় সংসদেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নগুলোর মধ্যে একটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’। এছাড়া আরও তিনটি ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক বাড়ি স্থানীয়ভাবে ‘মীরবাড়ী’ নামে পরিচিত। তার দুই ছেলের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত।
নামগুলোর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামের মিল থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ বিষয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ইউনিয়নগুলোর নামকরণে তার সন্তানদের নামের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, `আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম ‘নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, একটি ইউনিয়ন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় তার নাম ‘সীমান্ত’ রাখা হয়েছে এবং দূরবর্তী হওয়ায় আরেকটির নাম রাখা হয়েছে ‘দিগন্ত’।
এর আগে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রতিমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহারের নজির রয়েছে। ২০০১ সালে তিনি ‘বেতগাড়ী মীর শাহে আলম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেতগাড়ী মীর শাহে আলম কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।
এছাড়া নতুন উপজেলা সদরে ‘মোকামতলা মীর শাহে আলম-ছাত্তার তালুকদার মহাবিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিভিন্ন জ্বালানি স্টেশনের নামেও তার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহৃত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণ নিয়ে ওঠা বিতর্কের বিষয়ে সম্প্রতি সংসদে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, নাম নির্বাচন ভৌগোলিক ও স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং এতে ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।


