টেক্সাসে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ শেষে গ্যালারির আসনগুলো একদম নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে গেছেন জাপানের সমর্থকরা। নিজেদের ময়লা-আবর্জনা নিজেরা পরিষ্কার করার বিষয়টিকে তারা ‘জাপানি সংস্কৃতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
২-২ ব্যবধানের ড্র ম্যাচটি শেষ হওয়ার পরও দর্শকরা গ্যালারিতে থেকে যান, যাতে স্টেডিয়ামটি ঠিক যেমন পরিচ্ছন্ন অবস্থায় পেয়েছিলেন, তেমনই রেখে যেতে পারেন। তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সব ময়লা কুড়িয়ে নীল রঙের প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরছিলেন। এটি এমন একটি অভ্যাস যা জাপানিরা প্রথম প্রাথমিক স্কুলে শিখে থাকে। জাপানি সমর্থক এইতা তানাকা এএফপিকে বলেন, ‘আমাদের সবার কথা ভাবতে হয়।’
গায়ে জাপানের নীল জার্সি এবং হাতে একটি বিয়ার ও কয়েকটি কাপ নিয়ে ২০ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, ‘জাপানিদের মনে এই চিন্তাটি থাকে, আমরা যখন কোনো একটি জায়গা ব্যবহার করি, তখন চলে যাওয়ার সময় জায়গাটিকে আসার সময়ের চেয়েও বেশি পরিচ্ছন্ন করে রেখে যেতে হবে–আমাদের এমনই শেখানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন করেন, ‘স্কুলের ক্লাসরুমগুলোতে শিক্ষকরা না বললেও আমরা পরিচ্ছন্ন করি।’
জাপান এবার টানা অষ্টম বারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে এবং তাদের সমর্থকদের এই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের একটি অনন্য পরিচিতি বা ‘কলিং কার্ড’-এ পরিণত হয়েছে। এমনকি ম্যাচ শেষে এনএফএল কোয়ার্টারব্যাক জেমিস উইনস্টনকেও এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে দেখা গেছে। এ সময় তার গায়ে পিঠে নিজের নাম লেখা জাপানের নীল রঙের জার্সি জড়ানো ছিল।
ফুটো হাগিওয়ারা নামের আরেক জাপানি সমর্থক বলেন, ‘তার দেশবাসীর এই আচরণ যে বিশ্বমঞ্চে ইতিবাচকভাবে প্রশংসিত হয়েছে, এতে তিনি গর্বিত। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সংস্কৃতি। এর মানে হলো আমরা যেখানে যাই না কেন, চলে যাওয়ার আগে আমাদের নিজেদের জায়গা পরিষ্কার করতে হবে।’
সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক মাসাচি ওসাওয়া মনে করেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং চারপাশের মানুষের এক ধরনের মানসিক চাপের মিশ্রণ সমর্থকদের এই আচরণের পেছনে কাজ করে।
তিনি বলেন, ‘জাপানিরা বৈশ্বিক স্তরের ন্যায়বিচার–যেমন বৈশ্বিক অসমতা, যুদ্ধবিগ্রহ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় বড় বিষয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও ছোট পরিসরের নৈতিক বিষয়গুলোর প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন এমন মানুষের কথা আসে যাদের সঙ্গে তারা একই জায়গা ভাগাভাগি করছেন বা যাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে, তখন তারা তীব্রভাবে চান যাতে তাদের কারণে অন্য কারোর কোনো সমস্যা বা অস্বস্তি না হয়।’
জাপানি শিক্ষাব্যবস্থায় একদম ছোটবেলা থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো শিক্ষার একটি অংশ। সেখানে প্রতিদিন স্কুলে শিশুদের মেঝে এবং টেবিল মুছতে দেখা যায়। দেশটিতে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য রাস্তায় ডাস্টবিন বা ময়লা ফেলার পাত্র খুব একটা দেখা যায় না এবং প্রত্যেকে নিজেদের আবর্জনা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফেলবেন–এমনটা আশা করা হয়। এমনকি গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলার প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল, যেখানে ময়লাগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে আলাদা আলাদা করে ভাগ করতে হয়।
ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক স্কট নর্থ জানান, তিনি এবং তার প্রতিবেশীরা বছরে দুইবার একসঙ্গে জড়ো হয়ে আগাছা পরিষ্কার করেন এবং ঝরাপাতা ও ডালপালা কুড়ান। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের দলগুলোতে মূলত কিছু নেতা এবং অনুসারী থাকেন এবং তারা অনেকটা জাপানি ফুটবল সমর্থকদের মতো সুসংগঠিতভাবে কাজ করেন।’
জাপানে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করা মার্কিন নাগরিক নর্থ বলেন, ‘যেহেতু সবাই একসঙ্গে আসে, তাই সবার মনে একটি দলের অংশ হিসেবে কাজ করার প্রত্যাশা থাকে। আর দলনেতারা যখন ময়লা ফেলার ব্যাগ বের করে বলেন “এই নিন ধরুন”, তখন কেউ আর না করতে পারে না।’
সমাজবিজ্ঞানী ওসাওয়া বলেন, এই ধরনের আচরণকে জাপানিরা পরিস্থিতি বা চারপাশের পরিবেশ বোঝা বলে অভিহিত করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘জাপানে যদি একজন মানুষ ময়লা কুড়ানো শুরু করে, তবে তার চারপাশের বাকিরা মনে করে তাদেরও এতে যোগ না দিয়ে কোনো উপায় নেই। কারণ তারা যদি যোগ না দেয়, তবে দলের বাকি মানুষজন তাকে খারাপ ভাববে।’
তিনি এই মানসিক চাপকে একটি শক্তিশালী সামাজিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে মূল অনুপ্রেরণাটি কিন্তু স্টেডিয়াম পরিষ্কার রাখার তীব্র ইচ্ছা বা পরবর্তীতে যারা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করবেন তাদের কষ্ট কমানো নয়, বরং নিজের দলের মানুষের কাছে একজন বিরক্তিকর বা মন্দ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত না হওয়ার ইচ্ছাই এখানে প্রধান চালিকাশক্তি।’
কারণ যাই হোক না কেন, টুর্নামেন্টে যতদিন জাপান থাকবে, ততদিন তাদের সমর্থকরা গ্যালারি পরিষ্কার করার এই কাজ চালিয়ে যাবেন। আগামী শনিবার মেক্সিকোতে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে তাদের পরবর্তী ম্যাচ এবং সমর্থক হাগিওয়ারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে এই উদাহরণ তৈরি করে যেতে পেরে আনন্দিত।
তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত শিশুদের বলি না যে তোমাদের এটি করতেই হবে। আমরা কেবল আমাদের কাজ ও আচরণ দিয়ে তা ফুটিয়ে তুলি এবং অন্য মানুষরা আমাদের অনুসরণ করে।’


