মাগুরা সদর হাসপাতাল: যেখানে অসুস্থ হন সুস্থ মানুষ

মাগুরা সদর হাসপাতাল: যেখানে অসুস্থ হন সুস্থ মানুষ
মাগুরা সদর হাসপাতাল। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মাগুরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডে পাশাপাশি দুটি বেডে চিকিৎসাধীন আছেন আঠারখাদা গ্রামের দুই বোন। বড় বোনের চিকিৎসার দেখভাল করতে এসে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ছোট বোনও। পরে তাকেও একই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। একই স্ট্যান্ড থেকে দুজনকে দেয়া হচ্ছে স্যালাইন। ঘটনাটি যেন জেলার বৃহত্তম সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির সামগ্রিক দুরবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কাগজে কলমে এই হাসপাতালে আছে আধুনিক অবকাঠামো, সাততলা নতুন ভবন ও নানা চিকিৎসা সুবিধার সমাহার। কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থাপনা ত্রুটি, চিকিৎসক ও নার্স সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দালাল চক্রের উৎপাত এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীদের ফরিদপুর কিংবা ঢাকায় রেফার করা হয়। ফলে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জেলার চার উপজেলা ও আশপাশের এলাকার শত শত মানুষ।

শহরের কলেজপাড়া এলাকার কলেজ শিক্ষক লতিফ জামিল রোববার তার বড় ভাইয়ের অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে আসেন। রোগীকে সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সাথে সাথেই তাকে রেফার করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রোগীর অত্যন্ত নাজুক শারীরিক অবস্থা নিয়ে বাধ্য হয়ে তাদেরকে ঢাকায় রওনা হতে হয়েছে।

এ অবস্থা হাসপাতালটির নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দ্রুত হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন নিশ্চিত করার দাবি জানালেন এই কলেজ শিক্ষক। তিনি বলেন,  ‘মাগুরা সদরে হাসপাতালে একটু জটিল রোগী আসলেই সাথে সাথে তাদেরকে ঢাকা কিংবা ফরিদপুরের রেফার করে দেওয়া হয়। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা না পেয়ে পথেই মারা যান। আমরা এই অবস্থার উন্নয়ন চাই।’

শহরের পুলিশ লাইনপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, ‘স্ত্রীকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে আছি। পরিবেশ এতটাই খারাপ যে রোগীর সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতিটি বেডের নিচে, কক্ষের কোণায় ও আসবাবপত্রের ফাঁকে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপদ্রব। বাথরুমের পানি সরে না, বেসিনগুলো অচল, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও অভাব রয়েছে।’

আরও পড়ুন

শহরের নান্দুয়ালী এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান জানান, পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় তাকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অধিকাংশ ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। ফলে অনেক রোগীকেই মেঝেতে থাকতে হয়। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতিতে সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় একজন চিকিৎসককেই বিপুল সংখ্যক রোগীর দায়িত্ব পালন করতে হয়।

দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে উঠেছে হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থা। দুটি লিফট থাকলেও অধিকাংশ সময় সেগুলো অচল পড়ে থাকে। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীদের স্ট্রেচার কিংবা হুইলচেয়ারে করেই সিঁড়ি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা বাড়িয়ে দেয় স্বাস্থ্যঝুঁকি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মহসিন উদ্দিন ফকির জনবল ও রোগীর সংখ্যার অসামঞ্জস্যের কথা স্বীকার করে বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে সেবিকাসহ সংশ্লিষ্টরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাসও দেন তিনি।

স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু মাগুরা সদর হাসপাতালের বর্তমান চিত্র সেই অধিকারের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দ্রুত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, লিফট সচল রাখা, পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad