এক কর্মকর্তার জালিয়াতিতে বিপাকে হাজারও শিক্ষক

এক কর্মকর্তার জালিয়াতিতে বিপাকে হাজারও শিক্ষক
Advertisement
Advertisement

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরোত্তর সুবিধা পেতে মাসের পর মাস ঘুরতে থাকার মধ্যে এক কর্মকর্তার অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অবসর সুবিধা বোর্ডের সার্ভার ১০ মাস ধরে বন্ধ। এ কারণে বেশ কয়েক মাস শিক্ষক-কর্মচারীদেরকে অবসরোত্তর সুবিধা পাননি। এখন বিকল্প ব্যবস্থায় অবসর সুবিধা ছাড় করা হলেও তাতে জটিলতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

বোর্ডের প্রোগ্রামার মো. জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নথি জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তের তথ্য অনুযায়ী তিনি ভুয়া ইনডেক্স নম্বর এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে এই অর্থ তুলে নিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি জীবিত আবেদনকারীদের মৃত দেখিয়ে ভুয়া নমিনি তৈরি করেন।

গত বছরের জুন মাসে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। এরপর তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পেরে কর্তৃপক্ষ বোর্ডের মূল সার্ভারটি বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনার পর থেকে নতুন আবেদন জমা দেওয়া বা চলমান পেমেন্ট পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

অবসর সুবিধা বোর্ডের পরিচালক মো. জাফর আহমেদ জানান, সার্ভারের তথ্যে অনিয়ম পাওয়ায় সেটি বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তদন্তকারীরা সেখানে জাল ইনডেক্স নম্বর এবং ঘষামাজা করা নথির প্রমাণ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, তারা তথ্যের নির্ভুলতার ওপর আর ভরসা রাখতে পারছিলেন না। বর্তমানে বুয়েটের কারিগরি সহায়তায় একটি বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে মূল সার্ভারটি এখনো বন্ধ রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমের জন্য কোনো কার্যকর ব্যাকআপ ব্যবস্থা আগে থেকে ছিল না। বিকল্প একটি সফটওয়্যার চালু করা হলেও সেটি অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করছে। এখন পরিচয়পত্র ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য ম্যানুয়ালি যাচাই করতে হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দেখা গেছে, জামাল হোসেন একটি বাইরের লোকের সহায়তায় সফটওয়্যার সংক্রান্ত কাজগুলো করতেন। ওই ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কোম্পানির কোনো চুক্তি না থাকলেও তারা দুজন সিস্টেমে ভুয়া নথি আপলোড করতেন।

আরও পড়ুন

এই ঘটনায় জামাল হোসেনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, দুর্নীতির এই জাল আরও গভীরে বিস্তৃত থাকতে পারে। এই বিষয়ে জামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা এই দীর্ঘসূত্রতাকে প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন। বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, সিস্টেমের ফরেনসিক অডিট করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব হতো। সাধারণত এই ধরনের বিশ্লেষণে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন দশ মাস পরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলো না। তার মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ডিজিটাল আলামত মুছে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জানান, এই বিলম্ব খুবই উদ্বেগজনক। এটি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, ডিজিটাল জালিয়াতির মাত্রা অনেক বড় ছিল। একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ সিস্টেম ফিরিয়ে আনতে আরও সময় লাগতে পারে। তারা এখন সব তথ্য নতুন একটি প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরের কথা ভাবছেন। চুক্তিবদ্ধ সফটওয়্যার কোম্পানির কোনো গাফিলতি ছিল কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে চরম বিপাকে পড়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষক অবসর ভাতা পেতে আগে থেকেই চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। বোর্ড কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় ১৫ শতাংশ আবেদনকারী তাদের জীবদ্দশায় অবসর ভাতার টাকা পান না।

এই জালিয়াতির ঘটনা শিক্ষা খাতের ডিজিটাল সিস্টেমের দুর্বলতা এবং তদারকির অভাবকে বড় করে দেখিয়েছে। একজনের হাতে পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ থাকা এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজার হাজার শিক্ষক।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad