কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া একটি প্রকল্পের কারণে বন্যপ্রাণীর বিচরণ বাধাগ্রস্ত ও বাস্তুসংস্থানের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদসহ স্থানীয়রা। এ প্রকল্পের আওতায় সংরক্ষিত বনের ভেতরে দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করবে ইউএনডিপি ও স্থানীয় একটি এনজিও।
টেকনাফ রেঞ্জের মুছনী বিটের আওতাধীন নয়াপাড়া এলাকায় শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে এ প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একজন জানান, বনের একটি বড় অংশ জুড়ে সীমানা প্রাচীরটি আট থেকে দশ ফুট উঁচু হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে একটি স্থানীয় এনজিও এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, বনের করিডোরের ভেতর এই ধরনের কাঠামো বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ বন্ধ করে দেবে। এর ফলে প্রাণীদের আবাসস্থল খণ্ডিত হবে, দীর্ঘমেয়াদে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এছাড়া বনের ভেতর ঘেরা জায়গা তৈরি হলে সেখানে অবৈধ কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শালবাগান এবং এর আশপাশের প্রাকৃতিক উদ্যান এলাকাটি একটি বৃহত্তর সংরক্ষিত বনের অংশ। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ও সরীসৃপ বসবাস করে। মানুষের হস্তক্ষেপ এবং বসতি বিস্তারের কারণে এই বনের প্রাণীরা এমনিতেই চাপের মধ্যে আছে।
বনের পাহারায় নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা জানান, তারা এই এলাকায় বানর, শিয়াল, বন্য হাতি এবং বনমোরগ দেখতে পান। বনের ভেতর নতুন এই নির্মাণ কাজ প্রাণীদের বিচরণ ক্ষেত্রকে আরও সংকুচিত করবে। এতে বন্যপ্রাণীদের খাদ্যের অভাব তীব্র হবে এবং তাদের থাকার জায়গা হারিয়ে যাবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের বড় হস্তক্ষেপে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা প্রয়োজন। সঠিক সমীক্ষা ছাড়া এমন কাজ শুরু করলে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের টেকনাফ মুছনী রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ বলেন, প্রাচীর নির্মাণাধীন জমিটি বন বিভাগের মালিকানাধীন। তবে কাঁটাতারের বেষ্টনীর ভেতরে হওয়ায় সেখানে বন বিভাগের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাস্তবিকভাবে বেষ্টনীর ভেতরে বন বিভাগ অসহায়। তারা বেশ কয়েকবার নির্মাণ কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় ছাড়া স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
আরআরআরসি কার্যালয়ের ক্যাম্প ইনচার্জ শাহরিয়ার বিন মান্নান এ বিষয়ে জানান, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো কয়েকটি ক্যাম্পের বর্জ্য ছড়িয়ে পড়তে না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা।
তিনি আরও জানান, এ প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। এ ধরনের উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়েই নেওয়া হয় বলেও জানান শাহরিয়ার বিন মান্নান।
সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা বলছেন, মানবিক প্রয়োজন এবং বন সংরক্ষণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে এ ধরনের কাজ চালিয়ে গেলে টেকনাফের বন ও জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।


