পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় বৌদ্ধবিহার ও রাখাইন সম্প্রদায়ের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, সেখানে বন্দর নির্মাণের সময় উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোকে এখনো পুনর্বাসন করা হয়নি।
‘সিটিজেনস ফর হিউম্যান রাইটস’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিদের তিন দিনের সফর শেষে রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগ আনা হয়।
এতে বলা হয়, গত ১২ থেকে ১৪ জুন এই প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিরা কুয়াকাটা সফর করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘নাগরিক উদ্যোগ’-এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, ‘রান’-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং ‘ল্যান্ড ইজ লাইফ’-এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমা।
শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার
১২ জুন বিকালে কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বিহারের ভূমির দুর্দশার কথা জানিয়ে ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু বলেন, ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ২ একর ৪৪ শতাংশ জায়গায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পাকিস্তান আমলে, ১৯৬২ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় বিহারের অনেক জায়গা নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের বিহারের জমি নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। বর্তমানে বিহারের দখলে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি আমাদের বিহারের জায়গাটি নিয়ে নেয়, তবে এই সীমাঘরটিও আর থাকবে না। ফলে এটি আমাদের ধর্মীয় জীবনযাপনের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার
এই বিহারটির জায়গাও প্রভাবশালী বাঙালিরা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এর অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো। তিনি জানান, এই বিহারের জায়গার পরিমাণ ২ একরের বেশি হলেও অনেক জায়গা এখনো রেকর্ডভুক্ত হয়নি।
রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইন বলেন, ‘রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসৎ কর্মচারীর মাধ্যমে বাঙালিরা আমাদের জমি দখল করে নিয়েছে। যেখানে আদিবাসীরা ২ একর জমি বিক্রি করে, সেখানে তারা (দখলদাররা) ৫ একর জমি লিখে নেয়। আর আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক জমি উদ্ধার করতে পারছি না।’
নয়াপাড়া শ্মশানের বেদখল জায়গা
কুয়াকাটা উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের রাখাইন আদিবাসীদের শ্মশানভূমির জায়গা পারিবারিক দাবি করে গাছ রোপণ করেছেন বাবুল আখতার নামের এক বাঙালি। তার দাবি, তাদের দাদা আব্দুল হামিদ মিয়া রাখাইনদের কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, শ্মশানের গাছ লাগানো জায়গাটি আসলেই তাদের পরিবারের কি না, তা নিশ্চিত নয়।
প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে দখলদার বাবুল আখতার ও জমির মালিক রাখাইনরা নিজেরা মিলে জায়গাটি মেপে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।
উচ্ছেদ করা ৬ পরিবারের পুনর্বাসন কবে
২০২১ সালে পায়রা বন্দর নির্মাণের জন্য উচ্ছেদ করা ছ-আনি পাড়া গ্রামের ছয়টি রাখাইন পরিবারকে এখনো পুনর্বাসন করা হয়নি। বর্তমানে তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছেন।
উচ্ছেদ হওয়া একটি পরিবারের প্রতিনিধি চিং দামো রাখাইন বলেন, সে সময় ছয়টি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট ৯৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তখন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক স্থায়ী পুনর্বাসনের আগপর্যন্ত মাসিক ৫ হাজার টাকা করে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ছয় মাস দেওয়ার পর তা আর দেওয়া হয়নি।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ছয়টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য কলাপাড়ার সোনাপাড়া মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি কেনা হবে। কিন্তু জমিটিতে মাটি ভরাট ও ঘর বানানো এখনো বাকি আছে। চলতি জুন মাসেই এই পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। অথচ এর পর উচ্ছেদকৃত রাখাইনদের সেখানে রাখা হবে কিনা, তা কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না।
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার পর কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, ‘রাখাইনদের ভূমি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। কিন্তু জাল দলিলের মাধ্যমে তাদের ভূমিগুলো দখলের চেষ্টা করা হয়। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।’


