প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের হাতে করার অনেক কাজ যন্ত্রে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে যুগে যুগে, দেশে দেশে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, বহু পেশা হারিয়ে গেছে। পুরোনো পেশা ফেলে অনেক মানুষ বেছে নিয়েছেন নতুন পেশা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর আবির্ভাব হলে বিশ্বের অনেক ধরনের চাকরি নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ে। প্রযুক্তিনির্ভর অনেক কাজ যেগুলো এতদিন মানুষকে করতে হতো, সেগুলোও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে এআইয়ের আওতায়। সম্প্রতি জানা গেল, এআইয়ের কারণে কেবল যুক্তরাজ্যের লন্ডনেই অন্তত ১০ হাজার ধরনের চাকরিতে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।
এক গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, ১০ লাখ চাকরিতে পরিবর্তন আসায় কাজ হারাবেন অন্তত দুই লাখ টেলিমার্কেটার, দেড় লাখ বুককিপার এবং ৯৫ হাজারেরও বেশি ডেটা এন্ট্রি বিশেষজ্ঞ।
অনলাইন সিভি কোম্পানি লাইভক্যারিয়ার ইউকের ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্য যে চাকরিগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তার মধ্যে ফাস্ট ফুড এবং ওয়্যারহাউজের কর্মী, খুচরা পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্যাশিয়ার, প্যারালিগাল বা আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করা সহকারী এবং প্রুফরিডিংয়ের কাজ করা কর্মীরাও।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসেও এ বিষয়ে একমত। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এআই-এর প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা চাকরির বিজ্ঞাপনের গত তিন বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কমেছে।
আবার এই লাখো কর্মীর মধ্যে পুরুষদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে আছেন নারী কর্মীরা। কারণ তারা যেসব খাতে কাজ করেন সেগুলোয় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে এআই।
লাইভক্যারিয়ারের বিশেষজ্ঞ জেসমিন এস্কালেরা বলেন, ‘কোম্পানিগুলোর উচিত এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নেওয়া এবং এআই ব্যবহারের মাধ্যমে অজান্তেই লিঙ্গ বৈষম্য বাড়ানো থেকে বিরত থাকা।’
এআই এরই মধ্যে কাজের ভূমিকা বা পেশায় কী কী পরিবর্তন এনেছে বা ভবিষ্যতে আর কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। বিভিন্ন অফিসের কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন যে আপনি কীভাবে এই পরিবর্তনে সহযোগিতা করতে পারেন।’
যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত এনএইচএস ট্রাস্ট তার কর্মীদের সহায়তার জন্য এআই ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালের ফার্মেসিতে একটি রোবট ওষুধ বিতরণ করে আর এটিকে পরিচালনা করেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা।
এরপর এআই সেখান থেকে পাওয়া ডেটা ব্যবহার করে একটি প্যাটার্ন তৈরি করে, যাতে বোঝা যায় হাসপাতালের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য কোন ওষুধ কতটুকু ওষুধ প্রয়োজন।
যেমন, শীতকালীন ফ্লু মৌসুমে শ্বাসতন্ত্রের চিকিৎসা হয় এমন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত নেবুলাইজার থাকতে হবে।
লিউইশাম এবং গ্রিনউইচ এনএইচএস ট্রাস্টের চিফ ফার্মাসিস্ট রেচেল নাইট বলেন, ‘আমরা যা বিতরণ করছি, কাকে এবং কোথায় তা প্রয়োজন, এর জটিল বিশদ বোঝা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। ফার্মাসিস্টরা ম্যানুয়ালি কোনও প্যাটার্ন চিহ্নিত করতে পারতেন না, তবে এআই পারে।’
‘এটি আমাদের বলতে পারে কোথায় আমাদের ওষুধগুলি সংরক্ষণ করতে হবে যাতে সেগুলি রোগীটির কাছে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকে। এটি আমাদের পুরো কাজের প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলে।’
লিউইশাম এবং গ্রিনউইচ ট্রাস্টের ডিজিটাল হেলথ শাখার প্রধান জেইনাব হুসেইন বলেন, ‘আমরা এআই ব্যবহার করি মানুষের কাজ ছিনিয়ে নিতে নয় বরং কিছু একঘেয়েমি বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য’।
এনএইচএস তার কর্মীদের ভবিষ্যতের নতুন ভূমিকার সঙ্গে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে এআই ব্যবহার করছে বলেও জানালেন তিনি।
অন্য শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে?
এনএইচএসের কথা নাহয় বাদ দিলাম। কিন্তু লন্ডনের ‘হোয়াইট কলার’ জব হিসেবে পরিচিত তুলনামূলক ভালো চাকরিগুলোর এন্ট্রি লেভেলের ওপর এআই কেমন প্রভাব ফেলবে, সে প্রশ্ন এখন ঘুরছে।
ম্যাককিনসের গবেষণা অনুসারে, ২৫০ বা তার বেশি কর্মী রয়েছে এমন মাঝারি আকারের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর এক তৃতীয়াংশেরও বেশি বলেছে তারা এখন এআই ব্যবহার করছে। যার ফলে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে চাকরি বিজ্ঞাপনের সংখ্যা তিন বছর আগে একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কমেছে।
খুব ভালো চাকরি বলে সমাজে যেসব কাজের খ্যাতি রয়েছে সেগুলোতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে ৩৮ শতাংশ।
গবেষকরা বলছেন, যদি এভাবে এন্ট্রি-লেভেলে নিয়োগ কমে যায় তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ লোকবলের অভাবে পড়বে।
সে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই ব্যবহারের জন্য সঠিক কাজ চিহ্নিত করতে এবং মানব সৃজনশীলতা, বিচার এবং সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে জড়িত কাজগুলো চিহ্নিত করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অ্যামাজন, জেপি মরগান, মাইক্রোসফট এবং ফোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠান আগেই চাকরির বাজারে এআইয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছিল।
ফোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিম ফার্লি বলেছিলেন, ‘এআই যুক্তরাষ্ট্রে সব হোয়াইট কলার চাকরির কর্মীদের অর্ধেককে প্রতিস্থাপন করবে।’
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রযুক্তি খাত। ফলে এই খাতটির কর্মীরাই পড়েছেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে।


