ঋণখেলাপিদের ছবি প্রকাশের অনুমতি চায় ব্যাংকগুলো

ঋণখেলাপিদের ছবি প্রকাশের অনুমতি চায় ব্যাংকগুলো
Advertisement
Advertisement

ঋণ আদায়ের কাজ জোরদার করতে এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে ঋণখেলাপিদের ছবি প্রকাশের আইনি অনুমতি চেয়েছে দেশের ব্যাংকগুলো। এ লক্ষ্যে অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কিছু প্রস্তাব জমা দিয়েছে।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম শাখা পর্যায়ে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ব্যাংকের স্পন্সর-পরিচালকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকস’-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে সেই পদক্ষেপ স্থগিত করা হয়।

২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও প্রায় একই ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত তা থমকে যায়।

এরপর ২০২১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু বৈঠকে খেলাপি ঋণ আদায়ের আলোচনার অংশ হিসেবে বিষয়টি ফের তোলা হলেও ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।

গত বছরের ১২ নভেম্বর গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ৭ ডিসেম্বর এসব প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। চিঠিতে সই করেন এবিবির চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।

দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঋণ সংকটের মুখোমুখি, ঠিক তখনই এমন প্রস্তাব দেওয়া হলো।

তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণকৃত মোট ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, ব্যাংকের মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই এখন খেলাপি।

এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতে সরকার সর্বশেষ মোট ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬৫ জন ঋণখিলাপির সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। বর্তমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে প্রায় ৪ দশমিক ৮ গুণ বেশি।

এরপর থেকে ঋণখেলাপিদের সংখ্যার আর কোনো হালনাগাদ দেশব্যাপী পরিসংখ্যান জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

আরও পড়ুন

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, দীর্ঘ আইনি বিরোধ ও পদ্ধতিগত বাধার কারণে ধীর হয়ে যাওয়া ঋণ আদায়ের গতি বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ কমানোই তাদের লক্ষ্য।

একগুচ্ছ প্রস্তাবে খেলাপিদের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। এবিবি এমন আইনি ব্যবস্থা চায় যাতে আদালতের নির্দেশ ছাড়া খেলাপিরা বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারেন। তারা ঋণখেলাপিদের নাম ও ছবি প্রকাশ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুমতিও চেয়েছে।

সংগঠনটি ব্যাংক বা নিম্ন আদালতের নেওয়া যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার আগে ঋণগ্রহীতাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা ডাউন পেমেন্ট জমা দেওয়ার প্রস্তাবও করেছে।

ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ক্লাসিফিকেশনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ পাওয়ার আইনি সুযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবিবি।

দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের কারণে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের পক্ষ থেকে এই চাপ দেওয়া হচ্ছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ঋণগ্রহীতার ১ দশমিক ৬৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। যা বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণকে দাপ্তরিক হিসাবের বাইরে রাখছে।

এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৩১ জন প্রার্থী সিআইবি রিপোর্টের ভিত্তিতে তাদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন।

এনফোর্সমেন্ট বা প্রয়োগ জোরদার করতেও বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এবিবি এমন একটি ব্যবস্থা চেয়েছে যাতে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপি এবং তাদের জামিনদারদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক রেকর্ড যেমন আমানত, সম্পদের মালিকানা, আয়কর রিটার্ন এবং পাসপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

এছাড়া বিপুলসংখ্যক খেলাপি থাকা জেলাগুলোতে আলাদা অর্থঋণ আদালত স্থাপন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকর করা এবং ঋণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে আটকের মেয়াদ ছয় মাস থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, ঋণ আদায় বাড়াতে কিছু কারিগরি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খেলাপি ঋণের আংশিক অবলোপন (রাইট-অফ) এবং লিয়েন শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া দ্রুত করা।

মৃত্যু, মারণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহিতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে দ্রুত ঋণ সমন্বয়ের শর্ত শিথিল করার আবেদন জানানো হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad