ঈদুল আজহাকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের পশুর হাটগুলোতে হাসিল আদায় নিয়ে মহানৈরাজ্য চলছে। আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইজারাদার সিন্ডিকেট ‘ফোটা’ আর ‘চান্দার’ নামে প্রতি পশুতে ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। হাটে পুলিশ থাকলেও তাদের অবস্থান ইজারাদারের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ কিংবা রাস্তায়। চিকিৎসার কাজে প্রশাসন নিযুক্ত ভেটেরেনারি চিকিৎসকদেরও দেখা গেছে হাসিলের রশিদ লেখার কাজে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতায় এবার ইজারাদার সিন্ডিকেট ক্রেতা-বিক্রেতাদের পকেট কেটে নিজের পকেটস্থ করবে অতিরিক্ত ২৩৪ কোটি টাকারও বেশি। সরেজমিনে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রংপুর ও রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় এবার ৩৯ লাখ কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে জোগান আছে ৬৩ লাখেরও বেশি। প্রতিদিন এই অঞ্চলে সরকারি পেরিফেরিভুক্ত সাড়ে ৫০০ স্থায়ী-অস্থায়ী হাটে চলছে গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার বেচাকেনা।
অতিরিক্ত হাসিল আদায়
সরকারের হাটবাজার ব্যবস্থাপনা ও ইজারা নীতিমালার অনুচ্ছেদ-৫ অনুযায়ী, ক্রেতার কাছ থেকে প্রতি গরু-মহিষে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা এবং ছাগলসহ অন্যান্য পশুতে সর্বোচ্চ ২২০ টাকা হাসিল আদায় করতে পারবেন ইজারাদার। বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো হাসিল আদায় করা যাবে না। আইনে বলা রয়েছে, হাটের প্রতিটি স্থানে হাসিলের টোল চার্ট দৃশ্যমান করতে হবে। কিন্তু এই অঞ্চলের হাটগুলোতে ক্রেতার কাছ থেকে নির্ধারিত দরের চেয়ে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে অবৈধভাবে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আদায় করছে ইজারাদার সিন্ডিকেট, যা পুরোপুরি আইনের লঙ্ঘন।
রংপুর মহানগরীর লালবাগ, বুড়িরহাট, নিসবেতগঞ্জ, গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি, শঠিবাড়ি, কাউনিয়ার খানসামা, টেপামধুপুর, পীরগাছার পাওটানা, চৌধুরানী, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, পীরগঞ্জ, দিনাজপুরের আমবাড়ি, লালমনিরহাটের বড়বাড়িসহ উত্তরের বিভিন্ন হাটবাজার সরেজমিনে পরিদর্শন ও মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, সরকারি কোনো আইন বা নিয়ম মানছেন না ইজারাদাররা। হাটগুলোর কোনো স্থানে টোল চার্ট দেখা যায়নি। বরং প্রকাশ্যে প্রশাসনের নজরের ভেতরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এই হাসিল আদায় করা হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র
রংপুরের ঐতিহ্যবাহী লালবাগ হাটের সড়কে কথা হয় নগরীর আলমনগর স্টেশন এলাকা থেকে আসা এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানান, আগে ক্রেতার রশিদ ছিল ৬০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৮০০ টাকা। কারও কাছে ১ হাজারও নিচ্ছে। ক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ করারও কিছু নেই, বলারও কিছু নাই।’
রংপুরের গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি হাটের পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে পশু ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বেতগাড়ি হাটোত গরু ধরি আসি। ৬০০ ট্যাকার ফোটা (রশিদ মূল্য) নিচ্ছে ৭০০ টাকা। হাট ডাকি নিয়া ইজারাদাররা জনগণোক ঠাসি ধইরছে। গলা চিপি ধরছে এখন। যামরা বড়লোক তারা বড় লোক হচ্ছে।’
একই হাটে গরু এনেছেন সদরের পাগলাপীরের আকমল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বেতগাড়ি হাটের পরিস্থিতি খুব খারাপ। ফোটার দাম তো বেশি নিচ্ছে নিক, এখন চান্দাও নিচ্ছে ২০০ টাকা। আগে নিত একশ। ইজারাদার যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে হামরা গরু পাইলব কীভাবে। গরু পাইলতে গিয়ে হামার অবস্থা কাহিল। গরুর খাবারের দাম বেশি, খরচেও ওটে না। তার ওপর ইজারাদাররা জোর করি এভাবে চান্দা নিচ্ছে। সরকারি লোক তো দেখি না।’
কাউনিয়ার খানসামা হাটে বিক্রেতা আব্দুল আলিম বলেন, ‘এই হাটে একেবারে কঠিন অবস্থা। আমি গরু কিনে বিক্রি করি। এখানে শুধু ঈদের হাট বলে নয়, সবসময় এখানকার ইজারাদার বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেয়। আগে নিত ২০০ টাকা, এখন লাগাইছে ৩০০ টাকা। না দিলে ইজারাদারের লোকজন বের হতে দেয় না।’

ক্রেতা ছামিউল ইসলাম বলেন, ‘এই হাটে ইজারাদার কোনো নিয়ম মানে না। এখানে পশু কোরবানি হওয়ার আগে তারা মানুষকে কোরবানি করছে। সরকারি নিয়মের বাইরে গিয়ে তারা হাসিল নিচ্ছে। যেখানে ৬০০ টাকা নেওয়ার কথা, সেখানে আমার কাছে নেওয়া হলো ৮০০ টাকা। সেটা রশিদে লিখেও দিল না। এমন নৈরাজ্য চলছে।’
পীরগাছার চৌধুরানী হাটে বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, এখানে ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে ক্রেতার কাছ থেকে। আর বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩০০ টাকা।
পীরগাছার পাওটানা হাটে হাসিল প্রসঙ্গে জানতে চাইলেই টেপামধুপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহিদুল বলেন, ‘সরকারের কোনো নিয়ম নেই বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার। কিন্তু এই হাটে দেখলাম ২০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি। তারাও বলেছে বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবে না। কিন্তু তারা অ্যাকশন নেয় না। একজন ইজারাদারকে বলেছিলাম, বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নিলে রশিদ দিতে হবে, কিন্তু তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানান। হাটগুলোতে কোনো তদারকি না থাকায় এই নৈরাজ্য।’
গত সাত দিনে টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদক উত্তরের ১১টি হাট সরেজমিনে অনুসন্ধান করে সব হাটে একই চিত্র পেয়েছেন। হাটগুলোতে অতিরিক্ত এই হাসিল নেওয়ার বিষয়ে কোনো রাখঢাক নেই, একেবারেই খোলামেলা। হাসিল লেখকরাও অকপটে তা স্বীকার করেন।
‘ফোটা’ আর ‘চান্দার’ নেপথ্য কাহিনি
জানতে চাইলে বেতগাড়ি হাটের হাসিল লেখক বাবুল মিয়া জানান, ক্রেতার কাছ থেকে ৭০০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার কথা না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোরবানির হাট উপলক্ষে বেশি নেওয়া হচ্ছে। ইজারাদাররা নিতে বলেছেন তাই নিচ্ছেন।’
এসব হাসিল লেখক প্রতি পশু হাসিল (রশিদ) লেখা বাবদ ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমিশন পান। বয়স এবং সম্পর্কের ভিত্তিতে কমিশনের টাকা কম-বেশি হয়।
কাউনিয়ার খানসামা হাটের হাসিল লেখক মনিরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘আমরা ক্রেতার কাছ থেকে ৭০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা নিচ্ছি।’
বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়ার নিয়ম নেই–এমন প্রশ্নের জবাবে এই হাসিল লেখক জানান, ঈদ উপলক্ষে এটা নেওয়া হচ্ছে। তবে কেন নিচ্ছেন, এটা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন। রসিদ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রেতার রসিদে লিখি না কত নিচ্ছি। সেখানে শুধু গরুর দাম এবং বর্ণনা লিখছি। আর বিক্রেতাকে কোনো রসিদ দিই না। ইজারাদার কোনো রসিদও দেননি। আমি ২০ টাকা করে প্রতি রশিদ লেখায় কমিশন পাই। ইজারাদার যা বলেন সেটা শুনি।’
একই হাটের হাসিল লেখক আঙ্গুর মিয়া বলেন, ‘যখন ইজারাদারের কাছে হাটের অফিস থেকে বই নিয়ে আসি, তখন তারা আমাদের বলে দিয়েছেন–ছাগল বিক্রেতার কাছ থেকে ফোটা বা চান্দা বাবদ ১৫০ টাকা এবং যারা কিনবে তাদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা নিতে হবে। সেভাবে আমরা নিচ্ছি। আমরা হুকুমের গোলাম।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটগুলোতে ইজারাদারদের সরবরাহ করা রশিদের নিচে কমিশনের ঘর আছে, কিন্তু সেখানে কত কমিশন নেওয়া হলো তা কেউ লেখেন না। কারণ, নির্ধারিত ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
পীরগাছা উপজেলার চৌধুরানী হাটের হাসিল লেখক মিশু মিয়া জানালেন, ‘আমরা ক্রেতার কাছ থেকে ৭০০ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা নিচ্ছি। কিন্তু আমরা কোনোটাই রশিদে লিখি না। এটা হাট-ইজারাদার এভাবে বলে দিয়েছেন, আমরা সেভাবেই লিখছি। বিক্রেতাকে দেওয়ার জন্য কোনো রশিদও সরবরাহ করা হয়নি।’
কাউনিয়ার মধুপুর হাটের হাসিল লেখক মমতাজ মিয়া বলেন, ‘হাসিল ঈদ উপলক্ষে বেশি নিচ্ছি। ক্রেতার কাছে ফোটা বাবদ ৭০০ টাকা আর বিক্রেতার কাছে চান্দা বাবদ ৩০০ টাকা নিচ্ছি। ক্রেতার কাছে যেটা বেশি নিচ্ছি সেটা ফোটা হিসেবে নিচ্ছি।’
ফোটা এবং চান্দা কী–এ বিষয়ে টেপামধুপুর হাটের হাসিল লেখক মমতাজ খোলাসা করে জানান, ‘ফোটা’ হলো ক্রেতার কাছ থেকে যে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়। অর্থাৎ নির্ধারিত ৬০০ টাকার বেশি যে টাকা নেওয়া হয় সেটার নাম ফোটা। যেহেতু বেশি নেওয়া হয়, সে কারণে সেটা রশিদে লেখা হয় না। আর ‘চান্দা’ হলো বিক্রেতার কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়। যেহেতু এটা চান্দা, সেহেতু ওটার কোনো রশিদ দেন না ইজারাদাররা। হাটের খুঁটি, বিদ্যুতের লাইন, বাড়তি জায়গাসহ বিভিন্ন অজুহাতে এই চান্দা নেওয়া হয়।
ইজারাদারদের যুক্তি
হাট ইজারাদাররা অতিরিক্ত হাসিল আদায়কে খুব মামুলি ব্যাপার হিসেবে দেখেন এবং নানা ধরনের যুক্তি তুলে ধরেন। রংপুরের গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি হাটের ইজারাদার শওকত আলী পাপ্পু বলেন, ‘আমরা সাধারণত অতিরিক্ত কোনো টাকা নিই না। এখানে কিছু দরিদ্র শিক্ষার্থী কাজ করে, যাদের পড়াশোনার বইপত্র কিনে দিই। ওরাই রশিদে টুকটাক লেখে। কেউ খুশি হয়ে তাদের হাতে এক-দেড়শ টাকা দেয়, তাও কেবল বিশেষ পর্ব বা ঈদের হাটে। যেমন আজকের এই হাটে নিচ্ছে, পরের হাটে হয়তো নেবে না; এটি নিয়মিত কোনো বিষয় নয়। আমাদের নির্ধারিত হাসিল ৬০০ টাকা এবং রশিদের পাতায় ৬০০ লেখা আছে।’
অন্যদিকে, বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই যে বললাম, বিশেষ হাটে হয়তো ১০০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়।’
তবে এই হাটের নিয়মিত ক্রেতা আজিমুল ইসলাম ইজারাদারের এই দাবি অস্বীকার করে জানান, শুধু কোরবানির হাটে নয়, বছরের অন্যান্য সাধারণ সময়েও বিক্রেতার কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০০ টাকা করে আদায় করে বেতগাড়ি হাটের ইজারাদার সিন্ডিকেট।
গঙ্গাচড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাকিমুল ইসলাম জানান, শনিবার বেতগাড়ি হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় দুইজন হাসিল লেখককে ১৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ছিলেন। হাসিল লেখক তো ইজারাদার নিযুক্ত, তাহলে ইজারাদারের কোনো ব্যবস্থা কেন হলো না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সব করা হচ্ছে।
এদিকে কাউনিয়ার খানসামা ও টেপামধুপুর হাটের ইজারাদার কলেজ শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেভাবে ইজারা নিছি, তাতে আমাদের পোষায় না। আমরা রেট সংশোধনের আবেদনও করেছি। আপাতত আমরা বাড়তি খরচ, লাইটিং, মাইকিং এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনা খরচের কারণে ক্রেতার কাছ থেকে ফোটা ২০০ টাকা, বিক্রেতার কাছে চান্দা ৩০০ টাকা নিচ্ছি। এটা সামান্য কিছু বেশি নেওয়া হচ্ছে। ঈদের পরে এটা নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না এবং সরকারি যে বিধি আছে সেই বিধি অনুযায়ী আমরা কালেকশন করব।’
পীরগাছার পাওটানা হাটের ইজারাদার খোরশেদ আলম বলেন, ‘ক্রেতার কাছ থেকে ৬০০ টাকা এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ টাকা নিচ্ছি। আমরা হাটের জন্য স্কুল মাঠ ও পাশের জমি ব্যবহার করি। তাদের জন্য বিক্রেতাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নিচ্ছি। ঈদের হাট ছাড়া আমরা নিই না।’
পুলিশ ও চিকিৎসকদের ভূমিকা
হাসিল নিয়ে নৈরাজ্য ঠেকানোর কথা যাদের, তারাও নীরব। খানসামা হাটে দেখা গেল ইজারাদারের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে খোশগল্পে ব্যস্ত পুলিশ। মধুপুর হাটের ভেতরে নয়, রাস্তায় অলস সময় কাটাচ্ছে পুলিশ। চৌধুরানী হাটে মিলল খোদ সরকারি ভেটেরেনারি চিকিৎসক কাটছেন হাসিলের রশিদ। এই চিত্র পুরো উত্তরের।
কাউনিয়ার মধুপুর হাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মোকছেদ আলী জানান, তিনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না। তার ভাষাগত জ্ঞান নেই। আন্দাজে কী বলবেন, তা তিনি জানেন না।
পীরগাছার চৌধুরানী হাটে দেখা মিলল উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরেনারি হাসপাতালের এআই টেকনিশিয়ান ফারাজুল ইসলাম রঞ্জুকে হাসিল আদায়ের রশিদ লিখতে। তিনি ওই হাটের পশুর চিকিৎসার কার্যক্রমে উপজেলা প্রশাসন নিযুক্ত চিকিৎসক।

পশুর চিকিৎসা না করে কেন হাসিল লিখছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তো এটার দায়িত্বে নেই। আমি বসে আছি, এজন্য রশিদ লিখছি। ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলেন। হাসিল বেশি নেওয়ার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না, ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলেন। আমি এখানে ভেটেরিনারি টিম হিসেবে আছি। ফাঁকে ফাঁকে হেল্প করতেছি শুধু লিখে দেওয়ার জন্য, আর কিছু না।’
তবে প্রশাসনের অভিযানের খবরও পাওয়া গেছে। বেতগাড়িসহ বিভিন্ন হাটে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছে প্রশাসন। নজরে আসলে ছাড় নেই জানিয়ে রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি হাটে টোল চার্ট আছে। এর বাইরে কোনো টোল নেওয়ার সুযোগ নেই। যারা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন, তারা অবৈধভাবে আদায় করছেন। সব হাটে মাইকিং করেছি, যাতে কোনো ক্রেতা অতিরিক্ত টোল দিয়ে পশু না কেনেন। বিভিন্ন হাটে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করেছি।’
অবৈধভাবে পকেটে যাচ্ছে ২৩৪ কোটি টাকা
প্রশাসনের সঙ্গে সখ্যতার ভিত্তিতে হাসিল আদায়ে নৈরাজ্যের মাধ্যমে এই অঞ্চল থেকে ইজারাদার সিন্ডিকেট এবার অতিরিক্ত ২৩৪ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষক শাহিনুর রহমান।
তিনি জানান, উত্তরাঞ্চলে এবার ৩৯ লাখ পশুর প্রয়োজন কোরবানির জন্য। প্রতি বছর হাসিলের নামে যে নৈরাজ্যটি চলে, সেটি ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয়, যা মূলত একটি অন্যায়।
বলেন, ‘আইন অনুযায়ী বিক্রেতা কোনো হাসিল দেবেন না, ক্রেতা ৬০০ টাকা করে হাসিল দেবেন। কিন্তু হাটগুলোতে বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ কিংবা তারও বেশি এবং ক্রেতার কাছ থেকে ৬০০ টাকার পরেও অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা টাকা নেওয়া হচ্ছে। এখানে হিসাব করলে দেখা যায়, দুইজনের কাছ থেকে যদি গড়েও ৬০০ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তাহলে ৩৯ লাখ পশুর এই বাজার থেকে প্রায় ২৩৪ কোটি টাকা ইজারাদার সিন্ডিকেট নৈরাজ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছে। যেটা সরাসরি অবৈধ এবং অন্যায়।’
‘সরকারের জরুরি উচিত, এই যে নৈরাজ্যের মাধ্যমে ২৩৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত অন্যায়ভাবে ইজারাদার সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে, দ্রুত এটি বন্ধ করা। কারণ, এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের সঙ্গে এটি জড়িত। যত দ্রুত সরকার ব্যবস্থা নেবে, তত দ্রুত প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে প্রান্তিক চাষি যারা আছেন; তারা পশু পালনে আরও উৎসাহিত হবেন। নৈরাজ্য বন্ধ না হলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।’
শাহিনুর রহমান বলেন, ‘ঈদের হাটগুলো থেকে অন্যায়ভাবে নেওয়া এই অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়টি সরকারি যে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তদারকিতে থাকেন, তাদের মৌন সমর্থন বা লিয়াজোঁ ছাড়া এটা হওয়া অসম্ভব। হাটবাজারগুলোতে নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রশাসনের সে ধরনের কোনো তৎপরতা দেখি না। যদিও দুই-একটা অভিযান দেখি, সেটাও সংবাদমাধ্যমের চাপে। আবার সেই অভিযানেও হাসিল লেখকদের জরিমানা করা হচ্ছে, কিন্তু ইজারাদারদের করা হচ্ছে না। এ ধরণের নানান অসংগতি আছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে অ্যাকশন নেওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে থাকে। তাদের নজরে আসলে সেটি সিভিল প্রশাসনকে জানানোর দায়িত্ব। কেউ যদি অবহেলা করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে হাটগুলো ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, যে কারণে ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ হাটে নেই।’
অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, মাঠ পর্যায়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া আছে অভিযোগ আসা মাত্রই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার এবং সেটি মাঠে চলমান আছে। ক্রেতা-বিক্রেতাকেও এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। বিষয়টি মেনে না নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।


