মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শেভরনের কনডেনসেট তেলের পাইপলাইনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমানুষের ক্ষতি ছাড়াও ইলামপাড়া গ্রাম, জৈতা ছড়া গাঙ এবং হাইল হাওরের পরিবেশ–প্রতিবেশে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা পাইপলাইনে অবৈধ ট্যাপিংয়ের মাধ্যমে তেল চুরির চেষ্টার জেরে সোমবার গভীর রাতে প্রকৃতিক বনাঞ্চল এলাকায় কনডেনসেট তেল প্রথমে জৈতা ছড়ায় এবং পরে তা ভেসে হাইল হাওরে ছড়িয়ে পড়ে। পাইপলাইন থেকে নির্গত অপরিশোধিত তেলের দুর্গন্ধে আশপাশের বসতবাড়ির মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার শিকার হয়।
পরদিন মঙ্গলবার রাত ৯ টার দিকে ছড়ায় ভেসে থাকা তেলে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই আগুনে ধ্বংস হয় আশপাশে বিস্তৃত হয়ে অন্তত এক কিলোমিটার এলাকার গাছগাছালি, ঝোপঝাড় ও জীববৈচিত্র্য। আগুন ও তেলের প্রভাবে ছড়ায় ও হাওরে ব্যাপকহারে মাছ মরে ভেসে ওঠে। জৈতা ছড়ার পানিতে শত শত মৃত মাছ ভেসে থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয় পরিবেশবিদরা বলছেন, বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও প্রজনন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

তাদের মতে, তেলের আগুনে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, হাওরের পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে হাওরের মাছ উৎপাদন ও প্রতিবেশের ওপর পড়বে।
অবশ্য আগুন পাইপলাইনের ছিদ্রস্থলে না পৌঁছানোয় অল্পের জন্য বড় ধরনের বিস্ফোরণ থেকে রক্ষা পেয়েছে পুরো এলাকা। তবে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ–প্রকৃতিতে সৃষ্ট বিপর্যয় দীর্ঘদিন কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
সোমবারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভুনবীর গ্রামের একই পরিবারের তিনজন গুরুতর দগ্ধ হন। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হতদরিদ্র পরিবারটি পড়েছে চরম সংকটে।
অগ্নিদগ্ধদের স্বজন নাসিমা বেগম বৃহস্পতিবার দুপুরে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এখন আর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারছি না। গত দুই দিনে দুই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। এতটুকুই আমরা ঋণ করে খুব কস্ট চালিয়েছি। এখন যে চিকিৎসা ব্যয় চালাবো সেই সামর্থ্য নেই আমারদের।’
সরকার ও শেভরন কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ছালেক মিয়া জানান, পাইপলাইনের তেলটা গিয়ে জৈতা ছড়া ছোট নদী ভেসে গিয়ে হাইল হাওরে নেমেছে। এতে করে জলাশয়ের প্রচুর দেশিপ্রজাতির মরা মাছ ভেসে উঠেছে। হাওরের মাছেও বিরাট ক্ষতি হতে পারে।
তিনি জানান, আগুনে এলাকার বাঁশবন পুড়ে গেছে। তবে স্থানীয় বসতবাড়ির তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
শ্রীমঙ্গলে পরিবেশ বিপর্যয়: ভিডিও
পরিবেশবিদরা উদ্বিগ্ন
সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘ওই অগ্নি দুর্ঘটনার দু’টি দিক, সামাজিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ পরিবেশ।’
তিনি বলেন, ‘ছড়াগুলোর মধ্যে যে তেলের স্তর থেকে যাওয়ায় ‘জীব বৈচিত্র্যের বাস্তুতন্ত্রের (বায়োডাইভারসিটি ইকোসিস্টেম) মারাত্মক ক্ষতি হবে। নির্জন জলাভূমি, হাইল হাওর বা ছড়াগুলো জীববৈচিত্রের অভয়াশ্রম। এখন থেকে এ বিষয়ে সতর্ক না হলে ভবিষ্যতেও এমন দুর্ঘটনা থেকে আরো বড় ক্ষতি হতে পারে।’
অধ্যাপক আনোয়ার জানান, অগ্নিকাণ্ডে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের একটি বিস্তৃর্ণ অঞ্চল পুড়ে যাওয়ায় সেখানে আবারো প্রাকৃতিক বন সৃষ্টি হতে কয়েক বছর লাগতে পারে।
শেভরনের গ্যাস পাইপলাইনের নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ বিভাগের অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন ওই দুর্ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘এতে সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চলে শুধু মানবজীবন ও সম্পত্তিকেই বিপন্ন করেনি, বরং জলজ জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং এসব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকাকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।’
তিনি জানান, জলাভূমি, নদী ও বিলগুলোতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় পানির ওপরের স্তরে বিষাক্ত আবরণ তৈরি হওয়ায় অক্সিজেন বিনিময় কমে এসেছে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্ল্যাঙ্কটনের জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোককে বাধাগ্রস্ত করছে। হাইড্রোকার্বন ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পানিতে দ্রবীভূত হয়ে সরাসরি মাছ, চিংড়ি, শামুকসহ অন্যান্য প্রাণীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মাছের ডিম, লার্ভা এবং কিশোর স্তর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ– ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক মাছের ভাণ্ডার হ্রাস পাবে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিউল আহসান তালুকদার বলেন, ‘ওই দুর্ঘটনার ফলে বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন তরল পানির ওপর ভেসে থাকে এবং সূর্যালোক আটকে মাছ ও উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ বাধাগ্রস্ত করে। এই দূষণের ফলে হাইল হাওরের ফুড চেইন সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুমে এ ধরনের দূষণ চরম প্রভাব ফেলতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাওরের মাটি, পানি বিশ্লেষণ করে পূর্ণ রিপোর্ট তৈরি করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ইকো-রেস্টোরেশন টিম গঠন করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে গাছ লাগানো ও জীববৈচিত্র পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়াও দরকার।’
শেভরন যা বলছে
শেভরন বাংলাদেশের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক শেখ জাহিদুর রহমান স্বীকার করে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরে ছড়িয়ে পড়া তেলে পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে। তবে কেউ ইচ্ছে করে পরিবেশের ক্ষতি করেনি।’
ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রশ্নে তিনি জানান, বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।


