রাজধানীর উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের শুটিং হাউজগুলো বন্ধের জন্য চিঠি দিয়েছে বাড়ি মালিক সমিতি। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছে টেলিভিশন নাটকের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। এ নিয়ে বিস্তর শোরগোল চলছে সামাজিক মাধ্যমে।
উত্তরা কল্যাণ সমিতি সেক্টর-৪ এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘শুটিংয়ের কারণে রাস্তায় জনসমাগম, যান চলাচলে বিঘ্ন এবং বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’
২০ জুলাইয়ের এ চিঠিতে বাড়ি মালিকদের ‘শুটিং হাউস’ হিসেবে বাড়ি ভাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘আবাসিক এলাকায় এ ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নীতিমালার পরিপন্থী। সেক্টরের পরিবেশ ও সুনাম রক্ষায় হাউসের মালিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’
টাইমস অব বাংলাদেশকে চিঠির ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মর্তুজা আলী। তিনি এ প্রতিবেদককে হোয়াটস অ্যাপে একটি মশাল মিছিলের ভিডিও পাঠিয়ে বলেন, ‘এটি গেল সপ্তাহের একটি শুটিংয়ের ভিডিও। এ ধরনের শুটিং আবাসিক এলাকার নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়, যা নিয়ে প্রতিনিয়ত অভিযোগ আসছিল। এ ব্যাপারে আমাদের একটা গ্রুপ আছে, সেখানে সবার সঙ্গে কথা বলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে লাবণী-৪, লাবণী-৫ ও আপনঘর-২ নামে তিনটা শুটিং হাউজ আছে। শুটিং ইউনিটগুলো প্রায়ই রাস্তা বন্ধ করে শুটিং করে। রাত-বিরাতে শুটিং করে। এটা তো আবাসিক এলাকা। এখানে এভাবে শুটিং হলে তো আমাদের নিরাপত্তায় সমস্যা হয়।’
কীভাবে বিঘ্ন ঘটে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু বলেন, ‘আমি এখন পারিবারিক একটা কাজে ঢাকার বাইরে রয়েছি। আগামীকাল আমাদের মিটিং রয়েছে। তখন অফিসিয়ালি আরও যা বলার বলবো।’
সমিতির এ চিঠিকে শিল্প-সংস্কৃতির জন্য হুমকি বলে মনে করছেন নির্মাতা-প্রযোজক-শিল্পীরা।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মামুন অপু বলেন, ‘আমরা এ সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এটা দুঃখজনক। সারা বাংলাদেশে শিল্পী সংস্কৃতির উপর যেভাবে বেছে বেছে আঘাত করা হচ্ছে, সেটারই একটা অংশ মনে করি এটাকে। কারণ, তারা যে যুক্তিগুলো দিয়েছে সেগুলো ভ্রান্ত ও মিথ্যা। শুটিং ইউনিট মানেই আমরা শান্ত পরিবেশ পছন্দ করি।’
‘শুটিং হাউজের ভিতরে শতাধিক জন শুটিং করলেও কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। আমরা তো হৈচৈ করি না। আর যে শুটিং হাউজটা নিয়ে কথা হচ্ছে সেটা ২৫ বছরের পুরানো। সেটি উত্তরার সেক্টর-৪ এর একদমই শেষে অবস্থিত। এখানে রাস্তা ব্লক করে শুটিংয়ের কোনো প্রশ্নই আসে না। আর কেউ যদি ব্লক করেও তাতে কারো কোনো ক্ষতি হওয়ার কারণ নেই। ওই রাস্তার পরে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
নাট্য পরিচালকদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল হাসান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে চিঠির প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছি। আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। আমাদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে এটা নিয়ে কথা হয়েছে। মুরব্বীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এটা তারা অন্যায় করেছে। কারণ সোসাইটি তো কোনভাবেই এটা পারে না। এটা পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্পদ। তারা যেটা পারতো পূর্ত মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে পারত।’
শুটিংয়ের কারণে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্ন হয়—এমন অভিযোগের ব্যাপারে শুটিং হাউজ এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, ‘ওনারা যে অভিযোগ দিয়েছেন তা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না। অনেক রাত পর্যন্ত শুটিং হয়, চিল্লাচিল্লি হয়—এ বিষয়গুলো আসলেই এলাকাবাসীর জন্য বিরক্তিকর। তবে আমরা এ ব্যাপারে যদি সচেতন থাকি তাহলে কারো কোনো সমস্যা হয় না। আমরা তো ৩০ বছর এ সেক্টরে কাজ করি। যদি মোটামুটি এলাকাবাসীর সাপোর্ট না পেতাম তাহলে তো কাজ করতে পারতাম না।’
নিজেদের দোষের কথাও স্বীকার করে নিয়েছেন টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টেলিপ্যাব) এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজু মুন্তাসির। তিনি বলেন, ‘আমাদেরও সমস্যা আছে। আমরা বড় বড় লাইট জ্বালিয়ে কাজ করি। এতে আশেপাশের বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদের সমস্যা হয়। কারণ অনেকেই সকাল ৬টা-৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যান। এতে তাদের ঘুমে বিঘ্ন ঘটে। অনেকরকম সমস্যা হয়—এগুলোর জন্য তারা অভিযোগ করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বছর দুয়েক আগেও একবার ঝামেলা হয়েছিল। তখন আমরা চিঠি দিয়েছিলাম। তখন সবার সঙ্গে বসে কিছু নিয়ম করে দিয়েছিলাম আমরা। সেটা অনেকে ভঙ্গ করেছে। এ কারণে হয়তো তারা চিঠি দিয়েছে। এরপরও আমি ওনাদের বলেছি, এ চিঠি আপনাদের দেওয়া উচিত হয়নি। আপনাদের সেক্টরের মধ্যে তো ক্লাব, স্কুল, দোকানপাট রয়েছে। শুটিং হাউজটা আপনাদের গায়ের মধ্যে জ্বালা ধরে দিল কেন?’
সাজু মুন্তাসির জানান, বাড়ি মালিক সমিতির সঙ্গে তাদের শনিবার সন্ধ্যায় মিটিং রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা আশা করছি সামনাসামনি বসলে সকল সমস্যা মিটে যাবে। এটা তো সত্যি, আমাদের শুটিংগুলো আবাসিক এলাকার মধ্যে হচ্ছে। আবার সরকার আমাদের জন্য তো কোন জায়গা বরাদ্দ করে নাই। কিংবা আমরা যে লোকালয়ের বাইরে গিয়ে কোনো বাণিজ্যিক জায়গায় শুটিং করবো তারও সক্ষমতাও তো নাটক ইন্ডাস্ট্রির হয়নি। ওই জায়গা থেকে ওনাদেরকে বিবেচনা করতে বলবো। এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে বসে আমরা একটা নীতিমালা করার কথা ভাবছি।’


