নির্বাচনে অনিয়মের দায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। মঙ্গলবার সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড ভেঙে তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের এডহক কমিটি ঘোষণা করেছে এনএসসি। স্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে এই সিদ্ধান্ত নিলেও তা মানতে নারাজ বুলবুল। মঙ্গলবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বুলবুল জানিয়েছেন, এই এডহক কমিটি অবৈধ। একইসাথে দাবি করেছেন, এনএসসির এই তদন্ত প্রতিবেদন ‘ত্রুটিপূর্ণ ও আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’।
সেই বিজ্ঞপ্তিতে বুলবুল আরো দাবি করেন, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচনে কোনো ধরনের দুর্নীতি, কারসাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার তিনি করেননি। যদিও এনএসসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে নির্বাচনী এড-হক কমিটিতে থাকার পরেও ঢাকা বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে প্রভাব খাটিয়ে তিনি ও নাজমুল আবেদীন ফাহিম পরিচালক পদ নিয়ে বিসিবির নির্বাচনে লড়েছিলেন।
এনএসসির স্বাধীন তদন্ত কমিটিকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক উদ্যোগ’ বলে আখ্যা দিয়ে বুলবুল তার বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানান, ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল এনএসসিতে দাখিল্কৃত এই তদন্ত প্রতিবেদন আইনত বৈধ নয়। একইসাথে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচনকে স্বচ্ছ দাবি করে জানান, সংবিধান মেনেই সব পরিচালিত হয়েছিল ।
তার ভাষ্যমতে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গঠিত তিন সদস্যের বৈধ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। সেই কমিশনের প্রধান ছিলেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসাইন, নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ছিলেন সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি সিবগত উল্লাহ এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব)।
বুলবুল জানান, নির্বাচনের আগে ১৫টি ক্লাব এবং তামিম ইকবালের কাউন্সিলরশিপ নিয়ে যেসব আপত্তি উঠেছিল, সেগুলো ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর কোয়াসি-জুডিশিয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। তার দাবি, এরপর নির্ধারিত সময়েই ৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে ‘ফিক্সিং’ আখ্যা দিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা আসলে কিছু সাবেক ক্রিকেটারের রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা—যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
বুলবুলের মতে, এনএসসি এই বিষয়ে তদন্তের কোনো এখতিয়ারই রাখে না। স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে আরো বলেন, একটি স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া সংস্থার সম্পন্ন নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত করার ক্ষমতা এনএসসির নেই। আইসিসির নীতিমালা অনুযায়ী সদস্য বোর্ডগুলোকে সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই তদন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আইনগতভাবে ‘কো নন জুডিসিবাস’, অর্থাৎ এখতিয়ারবিহীন হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিবৃতিতে তিনি নির্বাচিত বিসিবি বোর্ড ভেঙে দেওয়া এবং তামিম ইকবালের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তকেও অবৈধ বলে অভিহিত করেন। তার দাবি, এমন পদক্ষেপ সংবিধানবিরোধী এবং আইসিসির নিয়মের পরিপন্থী। তিনি বলেন, বিশেষ কোনো চরম পরিস্থিতি ছাড়া একটি নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা এনএসসির নেই, আর বর্তমান পরিস্থিতি তেমন কিছু নয়। তার মতে, এই অ্যাডহক কমিটির কোনো বৈধতা নেই এবং বিসিবির পক্ষ থেকেও এটি স্বীকৃত নয়।
বুলবুল সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের ক্রিকেটের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। জনপ্রিয় ভোটকে উপেক্ষা করে এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে একটি সম্পন্ন নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করা হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মনে করেন। এতে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই অস্থিরতার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের ওপরও। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব–১৯ পর্যায়ের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে এবং শিল্প খাত চাপে রয়েছে, তখন খেলাধুলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
সবশেষে বুলবুল আইসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তার মতে, ক্রিকেট প্রশাসনের স্বাধীনতা রক্ষা এবং নির্বাচিত বোর্ডের বৈধতা বজায় রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর নিরপেক্ষ তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে পরে কোনো সরকারি সংস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। আদালত ভিন্ন কোনো রায় না দেওয়া পর্যন্ত নিজেকেই বিসিবির বৈধ সভাপতি হিসেবে দাবি করেন তিনি।


