কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিপণীবিতানে নতুন পোশাক, গয়না, জুতা বা সাজ সরঞ্জামের ঘাটতি নেই, অভাব যেটা, সেটা হলো ক্রেতা।
টানা চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মধ্যে এবার জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম নতুন করে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদ বাজার অনেকটাই ধীর।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এর সঙ্গে গত দুই-তিন বছরে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বৃদ্ধিও যুক্ত হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ উৎসবের সময় অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিচ্ছে।’
আগে যেখানে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষ একাধিক পোশাক, দামি শাড়ি, গহনা কিংবা ব্র্যান্ডেড পণ্যে বেশি খরচ করতেন, এখন সেখানে অনেকেই প্রয়োজনভিত্তিক ও মাঝারি বাজেটের কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ থাকছেন।
ঈদের দুই সপ্তাহের মতো সময় বাকি থাকতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শুক্রবার নিউমার্কেট ও বসুন্ধরা শপিং মলে গিয়ে জানা যায় ব্যবসায়ীদের হতাশার কথা। বেশিরভাগ দোকান এখনও ফাঁকা। অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের বাজারে মানুষের আগ্রহ কম এবং ক্রেতারা আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেনাকাটা করছেন না।
নূরজাহান মার্কেটের মারিয়া ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী বলেন, রোজার ঈদেও আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। ‘এখন পর্যন্ত কাস্টমার কম। তবে ঈদের বাকি দিনগুলোতে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করছি’, বলেন তিনি। দোকানটিতে টু-পিস ও ওয়ান-পিস পোশাকের চাহিদা বেশি।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পাকিস্তানি ও ভারতীয় পোশাক বিক্রেতা আলবেলি ফ্যাশনের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘এবার একদমই কেনাবেচা নাই। পুরো বছরই আগের বছরের তুলনায় খারাপ গেছে।’
অবশ্য কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের নিহার জামদানি কুটিরে। দোকানটির একজন প্রতিনিধির মতে, এবার ঈদের বাজার ‘মোটামুটি ভালো’। এই সময়ে তার দোকানে ‘কারচুপি জামদানি’ ট্রেন্ডে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেড়েছে পোশাকের দামও। আগে যেখানে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার শাড়ির চাহিদা বেশি ছিল, এখন সেখানে বেশি বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার টাকার মধ্যে শাড়ি, জানালেন সেই বিক্রয়কর্মী।
দোকানটিতে প্রায় ২৫০টি নতুন শাড়ি আনা হয়েছে এবং গুদামে আরও কয়েকশ শাড়ি রয়েছে।
কোরবানির ঈদে স্বাভাবিকভাবেই রোজার ঈদের তুলনায় বিক্রি কম থাকে, তারপরও এবার বাজারে চাপ কম, এমন কথা বলছিলেন একই মার্কেটের সুমাইয়া বস্ত্র বিতানের বিক্রয়কর্মী আবুল কাশেম। তিনি মনে করেন, ‘রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বেচাকেনা কিছুটা কমেছে।’
তাছাড়া যেসব ক্রেতা বাজারে আসছেন, তাদের বেশিরভাগই মাঝারি দামের পণ্য বেশি কিনছেন বলেও জানান তিনি।
বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড দেশালের একজন কর্মচারী জানান, ঈদ উপলক্ষে সুতির নতুন কালেকশন আনা হলেও এখন পর্যন্ত খুব বেশি ক্রেতা দেখা যায়নি। চাহিদা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম।
গয়নার দোকান কেজেড-এর এক বিক্রয়কর্মীর কাছে জানা যায়, ‘মানুষ এখন কম দামের জিনিস বেশি কিনছে।’ এদিকে ক্রেতা আকর্ষণে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছেন বলে জানান ইরানি বোরখা বাজারের বিক্রেতারা।
জ্যোতি শাড়ি ঘরের বিক্রয়কর্মীরাও বলেন, ‘ক্রেতা যারা আসছেন বেশিরভাগই বিয়ের জন্য বা উপহারের জন্য শাড়ি কিনতে আসছেন, ঈদের জন্য নয়।’
ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ এর প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লব সাহা বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে গত কয়েক বছরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও কেনাকাটার প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে।’ তার মতে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কোভিড-পরবর্তী প্রভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি বাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
‘বিভিন্ন সময় দোকান খোলার সময় কমিয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে ব্যবসা হ্যাম্পার হয়েছে’, বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজের মতে, বর্তমানে পরিবারের বড় অংশের আয় খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতে ব্যয় হচ্ছে। ফলে পোশাক বা বিলাসপণ্যের জন্য আলাদা বাজেট রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বাড়ায় বিদেশি পোশাক ও ব্র্যান্ডেড পণ্যের দামও বেড়েছে। তাই এখন অনেক ক্রেতাই ব্র্যান্ডের চেয়ে কম দামে টেকসই ও ব্যবহারযোগ্য পণ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, বলেন তিনি।


