বিদ্যমান অগ্রিম কর কমানো ও কিছু ক্ষেত্রে আরোপিত কর সম্পূর্ণ মওকুফ করায় কমতে পারে বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের উত্থাপিত বাজেটে এ তথ্য জানা যায়।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান ৫, ২ ও ১ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হবে।
এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেল এবং ফসলের বীজ। সেইসঙ্গে কৃষিভিত্তিক মূল্য সংযোজন খাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ ব্যবহার করে দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনের জন্য ১০ বছরের কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা খরচ কমাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর আমদানি অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি সহায়ক পণ্যের ওপর অগ্রিম কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করায় এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
বেশ কয়েকটি সরবরাহ চেইনেও ব্যাপক কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। সোনা ও গয়না সরবরাহের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিসাইক্লিং) কার্যক্রম ও কাঁচামালের ওপর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করায় এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
পরিবহন ও যানবাহন ভাড়া সেবার ওপর কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ এবং প্যাকেজিং উপকরণের ওপর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে কমতে পারে পরিবহন সেবার খরচ।
জ্বালানি খাতে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর অগ্রিম কর ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং শোধনাগারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর কর ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাবে কমতে পারে ভোক্তা পর্যায়ের বিদ্যুতের দাম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হবে এবং সৌর বিদ্যুতের বিল পরিশোধের ওপর ৫ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দেশীয় উৎপাদন শিল্পকে সহায়তা করতে স্থানীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ায় মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম এবং সিসিটিভি যন্ত্রপাতির দাম কমতে পারে।
প্রসাধন সামগ্রী আমদানির কাস্টমস মূল্যায়ন কমানোর প্রস্তাবে কমতে পারে লিপস্টিক, লোশন, ফেস ক্রিম ও ফেস ওয়াশের দাম।
ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করতে পিওএস মেশিনের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) সাধারণ মানুষের জন্য আরও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস এবং ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে উৎস কর পুরোপুরি মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়ির জন্য ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা এবং ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এক লাখ টাকা কর দিতে হবে।
বেশ কিছু কৌশলগত খাতে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামালের ওপর ২০৩১ সাল পর্যন্ত, ব্যাটারি উৎপাদন উপকরণের ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত, ৩৬টি কীটনাশকের কাঁচামাল এবং ৫১টি সক্রিয় ওষুধ উপাদানের (এপিআই) ওপর কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ফ্রুট ফিলেটের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং মর্গ বা লাশ রাখার হিমাগারের যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি এবং এসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে স্বস্তি দেওয়াে চেষ্টা করছে সরকার।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে ম্যানুফ্যাকচারিং,পর্যটন এবং ক্রীড়া অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য প্রথম বছরে ৬০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০ শতাংশ ত্বরান্বিত অবচয় (অ্যাক্সিলারেটেড ডেপ্রিসিয়েশন) সুবিধা চালুরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দাম বাড়তে পারে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন পণ্য ও খাতে কর, শুল্ক ও ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকায় বেশ কিছু ভোগ্যপণ্য, আমদানিনির্ভর পণ্য এবং বিলাসী সামগ্রীর দাম বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে স্থানীয় উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে কর রেয়াত, ভ্যাট অব্যাহতি ও আমদানি সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমদানিনির্ভর ও বিলাসবহুল পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের বাজারে। বাজেটে সিগারেটের সব স্তরের মূল্যসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। একইসঙ্গে নিকোটিন পাউচ, সিগারেটের ফিল্টার তৈরির কাঁচামাল এবং নিকোটিনের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের মূল্যসীমা ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং অতি-উচ্চ স্তরে ২১০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। ফলে সব ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোতে।
নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্য থেকেও বেশি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি এর ওপর উচ্চ হারে শুল্ক ও ভ্যাট আরোপের চিন্তা করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়তে পারে। কারণ দেশি মদ ও বিয়ার উৎপাদনে লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা নির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের মূল্য বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের মধ্যে কাজুবাদামের দামও বাড়তে পারে। কারণ, এর আমদানি শুল্ক বর্তমান ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে তাজা, ঠান্ডা ও হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব থাকায় বিদেশি মাছের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
নির্মাণ খাতেও বাজেটের প্রভাব পড়তে পারে। এমএস রড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর ও ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। রড তৈরির কাঁচামাল স্ক্র্যাপ শিটের ওপর টনপ্রতি ৩০০ টাকা এবং এমএস পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৪০০ টাকা কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পর নতুন এই কর কাঠামো নির্মাণসামগ্রীর বাজারে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিদেশি প্রসাধনী, উচ্চমূল্যের খাদ্যপণ্য এবং বিভিন্ন বিলাসী আমদানি পণ্যের ওপরও অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। নতুন করে অন্তত ১০ ধরনের পণ্যের আমদানি পর্যায়ে ২০ শতাংশ ভ্যাট বসানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দামও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবহন ও সেবাখাতেও প্রভাব পড়তে পারে। হেলিকপ্টারের নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা উৎসে কর আরোপের প্রস্তাব থাকায় হেলিকপ্টার সেবার ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাস পরিবহনের অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ায় গণপরিবহনের ভাড়ার ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কর ও শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছালে কয়েকটি খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।


