বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা। অন্যদিকে, দুই দেশের বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
সোমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. খলিলুর রহমান এবং ভারতীয় হাইকমিশনার পৃথকভাবে এসব অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় অস্বস্তি নিয়ে মতপার্থক্য বজায় থাকলেও ঢাকা ও দিল্লি কূটনৈতিক পথ খোলা রেখে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে চায়।
ব্যস্ত দিন শেষে ভারতীয় দূত সোমবার বিকালে ঢাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনা ও পরামর্শ নিতে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে খলিলুর রহমান বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে যে অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন, তা তৈরির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।’ এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ এবং হাদী হত্যায় অভিযুক্তদের ফিরিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বৈঠকে উঠে এসেছে এবং আমরা এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বলেছি। আমরা আশা করি ভারত এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।’
হাদী হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ভারতের কর্তৃপক্ষের চাওয়া অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সব নথি হস্তান্তর করেছে।
তিনি বলেন, ‘ভারত যেসব নথি চেয়েছিল, তার সবই আমরা দিয়েছি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় এবং এই খুনিদের দ্রুত আমাদের হাতে তুলে দিতে বলেছি।’
৫ আগস্টের ঘটনা
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যেখানে শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ও বর্তমান সরকার সম্পর্কে রাজনৈতিক মন্তব্য করেছিলেন।
ঢাকা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। রোববার ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘গতকাল আমি ভারতীয় দূতের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তিনি বিষয়টি এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরেছেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা ৫ আগস্টের ঘটনা নিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছি এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমি আশা করি এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।’
ভারতের দুটি আমন্ত্রণ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে–একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি বিমসটেক সভাপতি হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যদিও আমন্ত্রণে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। সফর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত সফরের বিষয়ে আমরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’
এদিকে, ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মুখিয়ে আছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদী সাংবাদিকদের কাছে আশা প্রকাশ করেন, দুই নেতার (তারেক-মোদি) সরাসরি বৈঠক বকেয়া মতপার্থক্য নিরসনে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, ভারতের জনগণ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই সফরের অপেক্ষায় আছেন। আমরা আশাবাদী যে দুই নেতা একসঙ্গে বসলে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। যদি কোনো সমস্যাই না থাকে, তবে তা আর যাই হোক গণতন্ত্র নয়।’
মতপার্থক্য নিরসনে আলোচনা
ত্রিবেদী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক এবং তা সম্পর্কের ক্ষতি না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘নিজের ঘরেও নানা সমস্যা থাকে। আমি যখন বাড়ি যাই, সেখানেও সমস্যা দেখতে পাই। এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আমরা সমাধান করতে পারি না। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি—এক সঙ্গে বসে সমাধান করা যাবে না, এমন কোনো বিষয় নেই।’
হাইকমিশনার আরও বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের চর্চা করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হলে তা দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।
তিনি বলেন, ‘এটি দুই দেশের জন্যই একটি উইন-উইন পরিস্থিতি। দুই দেশ ও তাদের সাধারণ মানুষ এটাই চায়। ভারতের সাধারণ মানুষ ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ চায় দুই দেশের সম্পর্ক যেন চমৎকার থাকে। এটাই স্বাভাবিক।’


