ঈদযাত্রা: সড়ক-রেলে ভোগান্তি, নৌ ও আকাশপথে স্বস্তি

ঈদযাত্রা: সড়ক-রেলে ভোগান্তি, নৌ ও আকাশপথে স্বস্তি
ছবি: সৈয়দ মাহমুদুর রহমান/টাইমস
Advertisement
Advertisement

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ছাড়া কোটি মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার পথে চার পরিবহণ মাধ্যমে দেখা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। সড়ক ও রেলপথে টিকিট সংকট, জ্বালানি সাশ্রয় নীতি এবং বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্যে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়লেও নৌ ও আকাশপথ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সড়কপথ: জ্বালানি সংকট ও ভাড়ার নৈরাজ্য

এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সড়কপথের যাত্রীরা। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সীমাবদ্ধতা ও বাসের ট্রিপ বাতিলের কারণে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত ১৪ মার্চ আশ্বস্ত করেছিলেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও দেশে ঈদযাত্রায় এর প্রভাব পড়বে না এবং ভাড়ার হারও বাড়বে না।

সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীও এসি বাসের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাজধানীর সায়েদাবাদ, গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনালের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তারা অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন। আনাস পরিবহনের একজন কাউন্টার কর্মী জানান, একটি বাসের যাওয়া-আসার জন্য ১৮০ লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও পাম্পগুলো মাত্র ৩০ লিটার করে তেল দিচ্ছে। তেল না পাওয়ায় ১৬ মার্চ তাদের কোনো বাস ঢাকা ছাড়তে পারেনি। একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তাজ পরিবহন, বুড়িমারী এক্সপ্রেস ও দর্শনা ডিলাক্সের মতো নামি সব কোম্পানি।

যাত্রীদের অভিযোগ, এই সুযোগে কালোবাজারি ও দালালের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। কুমিল্লাগামী যাত্রী রফিকুল ইসলাম জানান, দুই দিন চেষ্টা করেও তিনি অগ্রিম টিকিট পাননি। অন্যদিকে, যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর ঢাকা-খুলনা রুটে নন-এসি ভাড়া ৬০০ টাকা থাকলেও এবার তা ৮০০ টাকা করা হয়েছে।

নাসরিন আক্তার ও তানিয়া সুলতানার মতো সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগ করেন, এসি বাসের ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ার পাশাপাশি কাউন্টার থেকে টিকিট না দিয়ে দালালের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

তবে বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক আব্দুল আউয়াল দাবি করেন, তাদের ভিজিল্যান্স টিম ও ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে তৎপর রয়েছেন এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য ১৭ মার্চ থেকে জ্বালানি সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে গাবতলীর এসপি ফিলিং স্টেশন ও শাহজাহান ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া, পোশাক শ্রমিকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট আমজাদ হোসেন জানান, কারখানাগুলোতে পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়া হচ্ছে এবং বিআরটিসি’র ৫০০টি বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রেলপথ: টিকিটের হাহাকার ও কালোবাজারি

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে অনলাইন বা কাউন্টার কোথাও কাঙ্ক্ষিত টিকিট মিলছে না। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট না পেলেও প্রভাবশালী বা সুপারিশপ্রাপ্তদের জন্য ভেতরে অন্য ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দ্বিগুণ দামে ট্রেনের টিকিট বিক্রি হতে দেখা গেছে।

স্টেশন মাস্টার আনোয়ারুল ইসলাম স্বীকার করেন, মাঝেমধ্যে বিশেষ অনুরোধে টিকিট বরাদ্দ দিতে হয়। যদিও রেল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোচ এবং পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালু করেছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দণ্ডায়মান টিকিটে বাড়ি ফিরছেন।

নৌপথ: স্বস্তির নিঃশ্বাস

সড়ক ও রেলের বিশৃঙ্খলার বিপরীতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ভিন্ন আমেজ। বিআইডব্লিউটিএ-র যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, এবার ৩৭টি রুটে ১৭২টি লঞ্চ নিয়োজিত করা হয়েছে। যাত্রীদের সহযোগিতার জন্য ২০০ জন ভলান্টিয়ার বিনামূল্যে কুলি সেবা দিচ্ছেন। উপকূল রক্ষীবাহিনী (কোস্ট গার্ড), পুলিশ ও আনসার বাহিনীর উপস্থিতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

জান্নাতুল ফেরদৌস নীর ও নোমান আলীর মতো যাত্রীরা জানান, এবার ঘাটে কুলি বা দালালদের হয়রানি নেই এবং পরিবেশ বেশ সুশৃঙ্খল। কর্তৃপক্ষ ডেক ভাড়া ১০ শতাংশ কমিয়ে ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া সিঙ্গেল কেবিন ১২০০ এবং ডাবল কেবিন ২৪০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে প্রায় ৬০টি লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।

আকাশপথ: ব্যয়বহুল হলেও আরামদায়ক

আকাশপথে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও যাতায়াত ছিল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন। অভ্যন্তরীণ আটটি রুটে বর্তমানে ২৪টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ডোমেস্টিক এয়ার কন্ট্রোলার সোহরাব হোসেন জানান, সিলেট ও চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো কোনো কোনো রুটে ১১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিলেও নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে যাত্রীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad