যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করতে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি “কখন” হবে বা “আদৌ” হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ‘প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হতে পারে এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হবে।’
এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, দুই দেশ একটি চুক্তির খসড়া প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। তবে সেটি কার্যকর হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শীর্ষ নেতার অনুমোদন প্রয়োজন।
তবে এর পরপরই ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত বা নিশ্চিত হয়নি। কাজেই সেটি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অবশ্য ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচকরা এখন কয়েকটি “ভাষাগত বিষয়” (বিভিন্ন শর্তের ভাষা) নিয়ে আলোচনা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে “ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ” ইস্যু।’
‘আমরা এখনো সেখানে পৌঁছাইনি। তবে খুব কাছাকাছি আছি এবং চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাব।’
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং তাদের কাছে বর্তমান মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে) সরিয়ে ফেলতে হবে। কারণ তাত্ত্বিকভাবে এই উপাদান (৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স আশার সুরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস ইরান ‘সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই’ আলোচনা করছে। এর পেছনে সময়ক্ষেপণ বা ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলে কঠোর জবাব দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর আগে গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনির্দিষ্টকালের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, দুই দেশ একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং আলোচনা এগোচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তব ফলাফল পাওয়া যায়নি।
অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে জন্য ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র রাষ্ট্রগুলো, যুদ্ধবিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতারা এবং কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকান সদস্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্প এবং অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তি না হলে ‘বিকল্প পরিকল্পনা’ হিসেবে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার সুযোগ এখনো খোলা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আরও জটিল ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার সময় পাবে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তাদের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আলোচনা হবে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ওই ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে অথবা ইরানের সঙ্গে মিলে সেটিকে ইরানেই বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে নিষ্ক্রিয় বা ঝুঁকি কমাতে পাতলা করতে পারে।
খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে ‘বাধাহীন’ জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে এবং একই সঙ্গে ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ থেকে পুঁতে রাখা মাইন সরিয়ে ফেলতে হবে।
এ ছাড়া চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরের ওপর থেকে তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেবে, যাতে ইরান আবার তেল বিক্রি শুরু করতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস বৃহস্পতিবার সবার প্রথমে সম্ভাব্য চুক্তির খবর প্রকাশ করে। তারা জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রস্তাবিত চুক্তি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন দেননি এবং সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক দিন সময় নেবেন।
এর আগে বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দুই দেশের মধ্যে কথিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের খসড়ার কিছু অংশ প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে, ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে। এ ছাড়া জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থাপনা ও রুট নির্ধারণের দায়িত্ব ইরান ও ওমান যৌথভাবে পরিচালনা করবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়।
তবে হোয়াইট হাউস ওই খসড়াকে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর প্রকাশ পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, আলোচনা এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
দুই দেশই একে অপরের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে এবং প্রস্তাবিত চুক্তি সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধে তারা আসলে কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ে নেতৃত্ব দেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের আগে কিছু বলা সবসময়ই ভুল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টই নেবেন।’
ইরানের পুনর্গঠন কোনো সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির অংশ হবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগে চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে, তারপর পরবর্তী বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে।’


