ইরানকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা, ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ।
বুধবার অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আইএইএর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বোর্ড অব গভর্নরসের বৈঠকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে কোনো উপাদান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়নি—এ বিষয়টি যাচাই করতে তথ্য ও প্রবেশাধিকার দেওয়া “অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য”।
কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ সদস্যের বোর্ডে ২১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় রাশিয়া, চায়না ও নাইজার। এছাড়া ১০টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে এবং একটি দেশ বকেয়া সদস্যপদের কারণে ভোট দিতে পারেনি।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র।
কূটনীতিকরা বলেন, ইরানকে তার আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে চাপ বজায় রাখাই এ প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এ প্রস্তাব গৃহীত হলো। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং এর জবাবে তেহরানও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আইএইএ পরিদর্শকদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি তেহরান। যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণ শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ চুক্তি অনুযায়ী ইরানের আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ।
একইসঙ্গে জুনের হামলার পর থেকে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থাও যাচাই করতে পারেনি সংস্থাটি।
আইএইএর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। অস্ত্রমানের ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতা ৯০ শতাংশ হওয়ায় এটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বলেন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে তাত্ত্বিকভাবে ১০টি পর্যন্ত পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরান ইতোমধ্যে এমন অস্ত্র তৈরি করেছে।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
আইএইএতে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি প্রস্তাবটির সমালোচনা করে বলেন, এতে এমনভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে যেন ইরানে কোনো হামলা বা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি।
তার ভাষায়, সাম্প্রতিক হামলা ও নিরাপত্তা হুমকির কারণে ইরানে আইএইএর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার আইনি, কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমন সব স্থাপনায় আইএইএকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে সেই সহযোগিতার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
প্রস্তাবে গত এক বছরে পারমাণবিক বিস্তাররোধ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে ইরানের ব্যর্থতার জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে আইএইএ প্রথমবারের মতো প্রায় ২০ বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে তার নিরাপত্তা চুক্তি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে।
যদিও নতুন প্রস্তাবে ইরানকে সরাসরি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়নি, তবে ভবিষ্যতে কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে আইএইএ বোর্ড পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার জন্য উত্থাপন করতে প্রস্তুত থাকবে।


