তীব্র ভোগান্তির মধ্যেও লাখো মানুষের ঈদযাত্রায় যে বিষয়টি ফুটে ওঠে, তা হলো এই নগর ছেড়ে যাওয়ার স্বস্তি। জীবিকা বা অন্য কারণে এই শহরে থাকতে বাধ্য হওয়া দুই কোটি মানুষ যে এই শহরের জীবন উপভোগ করেন না, সেটিও থাকে তাদের প্রকাশে।
এই শহরের জীবন তাদের কাছে যন্ত্রণাক্লিষ্ট। এখানে পর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধার অভাব, নেই বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও। পরিবেশ দূষণের কারণে ঘরের বাইরে যাওয়াই এখানে যন্ত্রণার আরেক নাম।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকার মানুষ যে চাপের মধ্যে বসবাস করছে, সেটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও এককেন্দ্রিক উন্নয়নের ফল।’
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে এখানে আসছে, কিন্তু শহরের অবকাঠামো সেই চাপ বহনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়নি, বলছেন তিনি।
এই নগরবিদ বলেন, ‘যানজট, দূষণ, খোলা জায়গার সংকট এবং দীর্ঘ যাতায়াত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করছে।’
একটি বাসযোগ্য শহরে মানুষের হাঁটার জায়গা, পার্ক, খেলার মাঠ, নিরিবিলি খোলা পরিবেশ এবং কার্যকর গণপরিবহন থাকা জরুরি। কিন্তু ঢাকায় এসবের ঘাটতি মানুষের মানসিক ক্লান্তি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, শহরের যে কোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই মতটা এমনই আসে।
এই শহর ‘খুব কষ্ট দেয়’
দিনের শুরু মানেই নতুন এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি। সড়কে নামলেই যানজটের দীর্ঘশ্বাস, সঙ্গে কাজে দেরি হয়ে যাওয়ার অদৃশ্য আতঙ্ক। দিনের শুরুতেই সবাই বুঝে যান, দৌড়াতে হবে সময়ের এবং শহরের সঙ্গে।
মানুষের মনের এই চাপ জমতে থাকে শরীরে, আচরণে, সম্পর্কে, এমনকি চিন্তাভাবনাতেও। ঈদের সময় এই মানসিক চাপের একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। লাখো মানুষ যখন শহর ছাড়ে, তখন দীর্ঘ ভোগান্তির মধ্যেও তাদের মুখে দেখা যায় স্বস্তির হাসি। মনে হয় যেন মানুষ সাময়িকভাবে মুক্তি পাচ্ছে নগরজীবনের ক্লান্তি থেকে, ফিরে যাচ্ছে নিজেদের শেকড়ে।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় এক বেসরকারি ভবনের কেয়ারটেকারের চাকরি করা জাকির ইসলামের কণ্ঠে সেই বেদনা স্পষ্ট। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই শহরে তো বাধ্য হয়েই থাকি। খুব কষ্ট হয়। গ্রামে ছিলাম খোলামেলা আরামে। জায়গা ছিল নিজের। পরিবার পরিজন নিয়ে থাকতাম। প্রতিবেশীদের সঙ্গে খোশ গল্প করা যেত। কিন্তু এই শহর তো অনেক গম্ভীর। কারওই সময় নেই।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শামসু মিয়া বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবলেই আনন্দ লাগে। সারা বছর এখানে ব্যাবসা-বাণিজ্য করার জন্য থাকতে হয়, পরিবারের সবার সঙ্গে ঠিকমতো সময় কাটানোর সুযোগও হয় না। তাই, ঈদ এলে বাড়ি ফেরার জন্য মনটা ছটফট করে। এবারও অনেক দিন ধরেই অপেক্ষা করছিলাম কবে পরিবারের কাছে ফিরব।’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আব্দুল হামিদ টাইমসকে বলেন, ‘ঢাকার মানুষের মানসিক চাপকে আলাদা কোনো একক সমস্যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে ব্যক্তিগত, সামাজিক, পরিবেশগত এবং আবহাওয়াগত সব ধরনের চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে মানুষ বুঝে ওঠার আগেই দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেসের মধ্যে ঢুকে পড়ছে।’
‘বাসস্থান সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা, আর্থিক চাপ, চাকরির চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, পারিবারিক দূরত্ব, একাকীত্ব এসব বিষয় মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।
চিকিৎসাও এই শহরে এক ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতা। একটি সরকারি হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রাশেদা বেগম। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতাল ঘুরছিলেন তিনি। বললেন, ‘ডাক্তার দেখাইতে আসছি, কিন্তু এর মধ্যে আমরাই অসুস্থ হয়ে যাইতেছি।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক পরিসংখ্যান ঢাকার শ্রমজীবীদের মানসিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ৯০ শতাংশই কর্মক্ষম বয়সী মানুষ।
তবে মনের কষ্ট নিয়ে মানুষ চিকিৎসকের কাছে খুব একটা যায় না বলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাইমা নিগার। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘অনেক মানুষই মনে করেন, মানসিক সমস্যার কথা বললে সমাজ তাদের ‘দুর্বল’ বা ‘পাগল’ ভাববে। অনেকেই মনে করেন, দুঃখ বা চাপের কথা বললে তারা দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হবেন।’
প্রভাব শরীরেও
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে মানুষের শরীরেও। আগে যেসব রোগকে বয়সজনিত সমস্যা মনে করা হতো, সেগুলো এখন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে তরুণদের মধ্যেও।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিন আহমেদ বলেন, ‘আমার যে এই বয়সে ব্লাড প্রেসার হবে, আমি এটা ধারণাও করিনি। হঠাৎ করে একদিন আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। পরে জানতে পারি হার্ট অ্যাটাক করেছে। আসলে খাদ্যাভ্যাস আর স্ট্রেস থেকেই জিনিসটা হয়েছে।’
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ মো. মুজিবুর রহমানও বলেন, ‘অনেক কম বয়সী রোগী আমাদের কাছে আসছেন। শহরের জীবনকেই দায়ী করতে পারেন। রাতে জেগে থাকা, জ্যামে আটকে থাকা, অনিয়মিত খাবার, শারীরিক পরিশ্রম না থাকা সবকিছু মিলে সমস্যা বাড়ছে।’
শিক্ষার্থী মুনিয়া আহমেদ বলেন, ‘আমার ওয়েট গেইন হয়েছিল। আমি ফিল করেছি আমার কাজ করতে ভালো লাগে না। আমি মেন্টালি অনেক স্ট্রেসড আউট থাকি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আয়শা মাহমুদা টাইমসকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি আবেগগত বিচ্ছিন্নতা মানুষকে বার্নআউট কিংবা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
যন্ত্রণায় ক্লান্ত মানুষ
রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থা যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের কাছে শহরটি যেন আরও বেশি ক্লান্তিকর।
জমির আলী নামে একজন বলেন, ‘৩০ বছর ধরে ঢাকায়। যাতায়াত করলে মাথা ঘুরায়, শরীর ব্যথা করে। আগে এত কষ্ট লাগত না। এখন মনে হয় রাস্তাতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
মিরপুর থেকে মতিঝিলে অফিস করা বেসরকারি চাকরিজীবী তানজিল হক বলেন, ‘সকালে বের হওয়ার পর থেকেই একটা টেনশন কাজ করে যে আজ কত সময় লাগবে? কখনো বুক ধরফর করতে থাকে। অফিস করার পর শরীরে আর শক্তি থাকে না।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক অফিসযাত্রী নূরজাহান। তিনি বলেন, ‘অফিস যেতে অনেক সময় আধা ঘণ্টাও লাগে, অনেক সময় দেড় ঘণ্টাও লাগে। কখন যে পৌঁছাব সেটার কোনো ঠিক থাকে না। এটার জন্য দোষ হয় আমাদের।’
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আব্দুল হামিদ বলছেন, ‘যানজট শুধু সময় নষ্ট করছে না, মানুষের মানসিক সহনশীলতাও কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘসময় ট্রাফিকে আটকে থাকলে শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে উদ্বেগ, রাগ, অনিদ্রা এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে।’
রাইড শেয়ার বাইকচালক মো. সাদিক বলেন, ‘প্রচুর চাপ। শুধু চাপ না, ওদিকে পিছনে আবার পুলিশের ঝামেলা। সারাদিন রাস্তায় থাকতে থাকতে মাথা গরম হয়ে যায়।’
একই হতাশা সিএনজি অটোরিকশা চালক ইব্রাহিম ইসলামের কণ্ঠেও। ‘১৫ বছর ধরে খালি এরম হতেই আছি। কোনো সমাধান হয় না। খারাপ তো লাগবেই।’
দূষণ কেড়ে দিচ্ছে প্রাণশক্তি
বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় প্রায়ই উঠে আসে ঢাকার নাম। বাতাসে ধুলো আর বিষাক্ত কণার মাত্রাধিক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ শব্দদূষণ। সড়কে বের হলেই একটানা হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, মানুষের চিৎকার আর যানবাহনের গর্জনে শহর যেন কখনোই নীরব হয় না।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘দীর্ঘসময় শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র সবসময় সতর্ক অবস্থায় থাকে। এতে বিরক্তি, অনিদ্রা, উদ্বেগ, এমনকি রাগের প্রবণতাও বাড়ে। একইভাবে বায়ুদূষণও শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।’
মতিঝিল এলাকার গৃহিণী মাকসুদা জাহান বলেন, ‘হর্নের আওয়াজ সোজা ব্রেনে গিয়ে লাগে। আমার আব্বার মতন যারা হাই প্রেসারের রোগী আছে, তারা চমকে পর্যন্ত ওঠেন। বাসার জানালা বন্ধ রেখেও রেহাই পাওয়া যায় না।’
এখানেই শেষ নয়, শহরে অবকাশ যাপনের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, নেই নিরাপদ হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ কিংবা নিরিবিলি বসে থাকার পরিবেশ। ফলে ধীরে ধীরে নগরবাসীর বিনোদন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে রেস্টুরেন্ট, শপিংমল আর মোবাইল স্ক্রিনে।
পরিবেশবিদ আতিক রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ঢাকার নাগরিকদের মানসিক চাপ একটি পরিবেশগত স্বাস্থ্য সংকটও।’
‘নগর বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত শব্দ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উন্মুক্ত সবুজ জায়গার ঘাটতি এবং দীর্ঘসময় কৃত্রিম ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে। ঢাকার মতো উচ্চঘনত্বের শহরে পরিকল্পিত সবুজ অবকাঠামো, হাঁটার উপযোগী জনপরিসর, শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকেন্দ্রীভূত নগর উন্নয়ন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, জনস্বাস্থ্যগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে,’ বলেন তিনি।


