বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানে নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘গুরুতর ভুল তথ্য’ উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনার আইনজীবী স্টিভেন পাওলস। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ অভিযোগ করেন তিনি।
এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভসংক্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ হাবিবে মিল্লাত টাইমস অব বাংলাদেশকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে লেখা ওই চিঠিতে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের সদস্য পাওলস বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি নথিপত্র থেকেই এখন স্পষ্ট হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার যে দাবি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে করা হয়েছে, তা “অত্যন্ত ভুল ও বিভ্রান্তিকর”।’
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের অধিকাংশকে সামরিক রাইফেল ও গুলি ভর্তি শটগানের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে, যা সাধারণত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারি গেজেটের বরাতে চিঠিতে বলা হয়, এই গেজেট এখন প্রমাণ করছে যে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৮৩৪। এমনকি সেখানে ছাত্রনেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনও নিহতের সংখ্যা ৬৫০।
অবশ্য জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য, বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠনের মৃত্যুর তালিকা এবং পুনরাবৃত্ত তথ্য যাচাই না করেই নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পাওলসের দাবি, যদি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত করা হয়, তাহলে প্রকৃত সংখ্যা আরও কম হতে পারে।
‘প্রকৃত সত্য থেকে এত দূরে থাকা’ একটি সিদ্ধান্তে জাতিসংঘের প্রতিবেদন পৌঁছানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এতে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকে দেওয়া ও বৈধতা দেওয়ার জন্য ভুল তথ্য ব্যবহারের একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়েছে।’
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর যেন এই বিষয়ে সংশোধনী ও ‘ভুল তথ্য’ সংবলিত প্রতিবেদন প্রত্যাহারের প্রকাশ্য বিবৃতি দেয় সে বিষয়েও চিঠিতে অনুরোধ করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইনজীবী।
তিনি জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ বিষয়ে ‘স্বাধীন অনুসন্ধান’ চালায়।
স্টিভেন পাওলসের দাবি, জাতিসংঘের দল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ’ যথাযথভাবে যাচাই না করায় ‘গুরুতর ভুল তথ্য’ সংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ক্ষমতায় আসার পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করে হয় চিঠিতে। পাওলসের মতে, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এসব অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরের কাছেও অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ইউনূস নিজেই স্বীকার করেছেন–হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি অভিযান। তিনি তার ‘বিশেষ সহকারী’ মাহফুজ আলমকে এই দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনের মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
‘জাতিসংঘের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ও ইউনূসের প্রভাব ছিল নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে’ উল্লেখ করে পাওলস বলেন, ‘হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই অনুসন্ধান কার্যক্রমে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে হচ্ছে।’
অনুসন্ধানের সময়সীমা শুধু ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখায় অন্তর্বর্তী সরকারের পরবর্তী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্তের বাইরে থেকে গেছে বলেও অভিযোগ জানিয়েছেন শেখ হাসিনার আইনজীবী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের মতো সহিংস বিক্ষোভে এত মানুষের মৃত্যু অবশ্যই একটি মর্মান্তিক ঘটনা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ তদন্তে একটি কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় ছিল। তবে অতিরঞ্জিত মৃত্যুর সংখ্যা ব্যবহার করে হাসিনাকে “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গণহত্যার নির্দেশদাতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটি ছিল সরকার উৎখাতের প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
এ নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত টাইমসকে বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে এই ৮৩৪ মৃত্যুর প্রতিটির ঘটনা ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে’ তদন্ত করা আবশ্যক।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে কলঙ্কিত করতে কিংবা দলের নেতাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলা দায়ের করার উদ্দেশ্যে এই পুরো সংখ্যাটিকে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না।’
আরাফাত আরও উল্লেখ করেন, ‘কোনো মিথ্যা বা যাচাইবিহীন আখ্যানের’ ওপর ভিত্তি করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় এবং যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেবল একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্তই’ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন–রাজনৈতিক অপব্যবহার নয়, বরং সঠিক ও সুষ্ঠু তদন্তই হলো ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন এভাবে ‘ভুল ও উসকানিমূলক তথ্যকে বৈধতা দেওয়ার’ কাজে ব্যবহৃত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি ভবিষ্যতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে বলেও অভিযোগ করা হয় চিঠিতে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে জাতিসংঘ যেন ভুল তথ্য প্রচারের হাতিয়ার হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিতে ওই প্রতিবেদন সংশোধন ও প্রকাশ্য বিবৃতিতে পুরো বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্টিভ পাওলস।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৪ অক্টবর ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আওয়ামী লীগের পক্ষে জমা দেওয়া যোগাযোগপত্র প্রকাশিত হয়।
সেখানে স্টিভ পাওলস রোম সংবিধির ১৫ অনুচ্ছেদের অধীনে আওয়ামী লীগের পক্ষে তদন্ত শুরু করতে আদালতের প্রসিকিউটরকে অনুরোধ জানান।
ওই যোগাযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশে সংঘটিত বিক্ষোভের (জুলাই আন্দোলন) পর হাসিনার সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিবেচিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধমূলক’ সহিংসতা চালানো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ২০১০ সালের ২৩ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুমোদন করে এবং ২০১০ সালের ১ জুন থেকে এই সংবিধি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়।
যোগাযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর নিরযাতন, নিপীড়নের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, অবৈধ আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। তাই এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটরের তদন্ত শুরু করা প্রয়োজন।
স্টিভেন পাওলসের মতে, বাংলাদেশে এসব অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত বা বিচার হওয়ার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থা না নিলে দায়মুক্তি থেকেই যাবে।
যোগাযোগপত্রে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অন্তত ৪০০ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের অনেককে গণপিটুনি ও মব সৃষ্টির মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা এবং হাসিনা সরকারের সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের (ওএইচসিএইচআর) কার্যালয়ের প্রতিবেদনটি প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে ‘গুরুতর প্রশ্ন’ তোলে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিবের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় যেকোনো ধরনের বেআইনি বলপ্রয়োগের ঘটনা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা উচিত; তবে জবাবদিহিতা অবশ্যই যাচাইকৃত তথ্য, বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
নওফেল এই প্রতিবেদনের সংকীর্ণ পরিধির সমালোচনা করে বলেন, হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর যে সমস্ত হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে এসেছে, তা এই প্রতিবেদনে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ঘটনাগুলোর একটি ‘স্বচ্ছ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন’ তদন্ত পাওয়ার দাবি রাখে, যা পুরো বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করবে।
তিনি এটিকে একটি ‘আংশিক আখ্যান’ হিসেবে অভিহিত করেন, যা তার মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থক ও ২০২৪ সালের আগস্টের পর সামনে আসা চরমপন্থী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে তৈরি হয়েছে।


