ভারতের অব্যাহত পুশ ইন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত দু’মাসে অন্তত ২২টি সীমান্ত পথে এপারে পুশ ইন হয়েছে প্রায় দু’হাজার। এতে দেখা দিয়েছে এক নজিরবিহীন মানবিক ও কূটনৈতিক সংকট।
পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে কখনোই অল্প সময়ে এতো বেশি পুশ ইন করেনি প্রতিবেশি দেশটি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ ক্ষেত্রে ঢাকার অব্যাহত প্রতিবাদ তো বটেই, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনকেও গ্রাহ্য করছে না দিল্লি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের পুশ ইন আন্তর্জাতিক রীতি এবং ১৯৭৪ সালের ভূমি সীমানা চুক্তি ও ২০১১ সালের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার (সিবিএমপি) মতো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুদিন আগে এ নিয়ে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানালেও এর জবাব দেয়নি ভারত।
এছাড়া ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী—বিএসএফ সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করে হত্যাও অব্যাহত রেখেছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর পক্ষ থেকেও একাধিকবার সীমান্ত বৈঠকে পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিজিবির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অপারগতা জানিয়েছে।
পুশ ইন-এর প্রশ্নে ভারতের পদক্ষেপ সব আন্তর্জাতিক আইন, রীতিনীতি ও সনদ লঙ্ঘন করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এমনকি এক্ষেত্রে দেশটির নিজস্ব আইনকানুন ও সংবিধানও মানা হচ্ছে না।
গত কয়েক মাসে দিল্লি, রাজস্থান, জম্মু কাশ্মির, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা ও কর্নাটক রাজ্য থেকে অনেক বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে দেশটির সরকার ঢালাওভাবে আটক করে পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের রাজ্যে। পরে তাদের এপারে পুশ ইন করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. সারওয়ার হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, পুশ ইন নিয়ে ভারতের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে এখন সংযমের সঙ্গে কিন্তু কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আগে আসা উচিত—উচ্চপর্যায়ে আলোচনা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং একটি যৌথ যাচাই কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে, যেখানে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এর ফলে পরিচয় নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একতরফা ফেরত ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।’
‘এটি কেবল সীমান্ত ইস্যু নয়,’ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক কূটনীতির একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেই আমাদের কৌশলগত ও নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।’

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, ‘পুশ ইন কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না। এটা ঠেকানো হবে।’
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিজিবির অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি জানান, পুশ ইন বন্ধে বিএসএফকে জানানোর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে। শুরু থেকে বিজিবি এর কড়া প্রতিবাদ করে আসছে।
এদিকে, ভারতের এ ‘পুশ ইন প্রক্রিয়া সঠিক নয়’ বলে মন্তব্য করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে এভাবে পুশ ইন করাটা সঠিক প্রক্রিয়া নয়। আমরা এরই মধ্যে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেন, ‘পুশ ইন বা পুশ ব্যাক কোনো আইনসম্মত পদ্ধতি নয়। আমরা ভারতের মতো কাউকে পুশ ইন করি না, আমরা কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি পরিচয়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত মানুষজনকে পুশ ইন করছে। সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী। আমরা সবসময় আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকল অনুসরণ করে আসছি।’
বিজিবি জানিয়েছে, গত ৭ মে থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্তে দিয়ে এপারে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে এক হাজার ৮৮০ জনকে, যা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে। সবশেষ গত ১০ জুলাই বিএসএফ নেত্রকোনার বিজয়পুর সীমান্ত দিয়ে ২১ জনকে পুশ ইন করেছে।
গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি পুশ ইন হয়েছে মৌলভীবাজার সীমান্তে ৫০২ জনকে। এ সময় সিলেটে ২৫০, খাগড়াছড়িতে ১৬০, লালমনিরহাটে ১২৮, সাতক্ষীরায় ১১০, পঞ্চগড়ে ৯৯, চুয়াডাঙ্গায় ২৫, মেহেরপুরে ৫০, ফেনীতে ৬৭, ময়মনসিংহে ৩১, নেত্রকোণায় ৩২, কুড়িগ্রামে ৯১, ঠাকুরগাঁওয়ে ৬৯, দিনাজপুরে ৪৩, কুমিল্লায় ১৩, ঝিনাইদহে ৫২, কুষ্টিয়ায় ৯, হবিগঞ্জে ৪৩, সুনামগঞ্জে ৫৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৫, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ৭ এবং নওগাঁয় একজনকে পুশ ইন করা হয়।


